আদানির ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরসহ সরকারের ৫/৬ জন শীর্ষ কর্মকর্তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এই অর্থ কীভাবে, কে দিয়েছে, এর প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে ১০ বছরে লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ১০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ সেক্টরের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে গঠিত জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য জানানো হয়েছে।
কমিটির চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য রোববার বিকালে রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ১৫২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশসহ ৩০ পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ পাওয়ার পয়েন্টে উপস্থান করা হয়। এসব প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বিদ্যুৎ কেনার জন্য দেশি-বিদেশি যেসব কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়, এর সবই আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। প্রতিটি চুক্তি করা হয়েছে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে ভারতের আদানির সঙ্গে করা চুক্তিতে। একইভাবে দেশটির রিলায়েন্স গ্রুপকেও দেওয়া হয়েছে অনৈতিক সুবিধা। যে সুবাদে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের পরিত্যক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র (৭১৮ মেগাওয়াটের) বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে এনে বসাতে সক্ষম হয়। এ কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেওয়ার মতো গ্যাস নেই জেনেও সরকার রিয়লায়েন্সের সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে। এমনকি রিলায়েন্স কয়েক বছর আগে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র জাপানের জেরা কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে চলেও গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আদানির চুক্তির মতো দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি আর হয়নি। এ চুক্তির কারণে বাংলাদেশ এখন ঝুঁকিতে এবং প্রতিবছর আদানিকে ৫০ কোটি ডলার বা ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বিল দিতে হচ্ছে। কমিটির তথ্য অনুযায়ী ২৫ বছরে আদানিকে ১২ বিলিয়ন ডলার বা দেড় লাখ কোটি টাকা বেশি দিতে হবে বাংলাদেশকে।
কমিটির সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এ চুক্তির গঠন দেখে মনে হচ্ছে এতে বেশ দুর্নীতি হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে পর্যান্ত তথ্যপ্রমাণ থাকলে সরকার আদানির চুক্তি বাতিলও করতে পারে।
কমিটির সদস্য ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আদানির বাইরে অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) মালিক, রাজনীতিক এবং আমলা মিলে একটি সিন্ডিকেট বিদ্যুৎ খাত এবং দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ফেলে দিয়েছে। কমিটি কাগজপত্র এবং চুক্তি ঘেঁটে দেখেছে, প্রয়োজন নেই; তবুও বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত ৭,৭০০ থেকে ৯,৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র বসাতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ না পেয়েও সরকারকে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে বছরে ১৮ হাজার কোটি টাকা।
এক প্রশ্নের জবাবে কমিটির আহ্বায়ক বিচারপতি মইনুল বলেন, আদানিসহ বিভিন্ন চুক্তি বাতিল বা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে এ সরকারের হাতে বেশি সময় নেই। তবে আগামী নির্বাচিত সরকার যেন এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তার সুপারিশ করা হচ্ছে। কমিটি সামিট মেঘনাঘাট-২ এবং এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ারের চুক্তিতেও বড় ধরনের গলদ আছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আদানি চুক্তিতে ভয়াবহ দুর্নীতির ক্ষত : আদানির চুক্তির ব্যাপারে কমিটির সদস্য ড. জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, এ চুক্তিতে অনিয়ম-দুর্নীতির কোনো সীমা নেই। প্রথমত, এটি মহেশখালীতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতের গোড্ডার ঝাড়খণ্ডে কেন হলো, এর কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। সবাই জানে ঝাড়খণ্ডে সস্তায় কয়লা পাওয়া যায়। ভারতের আইন অনুযায়ী স্থানীয় কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ রপ্তানি করা যায় না। তাহলে কেন ঝাড়খণ্ডে করা হলো, এর কোনো যুক্তিও নেই। চুক্তিতে আছে অস্ট্রেলিয়া থেকে গোড্ডায় কয়লা এনে আবার ঝাড়খণ্ডে নিয়ে যাওয়া হবে। সেই কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ ১৫০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন দিয়ে বাংলাদেশে আনা হবে। এজন্য বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে তাদের বাড়তি দাম দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভারতের অন্যান্য কেন্দ্র থেকে (কয়লাভিত্তিক) প্রতি ইউনিট ৪.৪৬ সেন্টে ক্রয় করলেও বাংলাদেশ আদানি থেকে কিনছে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে। অথচ অর্থনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, আদানির কেন্দ্রে অন্যান্য কেন্দ্রের চেয়ে আরও কম হওয়ার কথা। কারণ আদানির কেন্দ্র বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র। বড় কেন্দ্রে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় হয় কম। দাম বাড়ানোর ব্যাপারে বলা হয়েছে, কয়লার দাম ভারত বা অন্যান্য দেশের দাম না ধরে কেন অস্ট্রেলিয়ার ধরা হলো, এর কোনো ব্যাখ্যা বিদ্যুৎ বিভাগের ফাইলে নেই। তিনি বলেন, ভারতে রাজনৈতিক কারণে আদানির কোনো ক্ষতি হলে বাংলাদেশকেই তা বহন করতে হবে। এছাড়া বকেয়া সুদের হার প্রতিমাসে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। সব বিল দিতে হবে ডলারে। পুরো চুক্তি যাচাই করে কমিটির সবাই একমত হয়েছে যে, ভয়াবহ দুর্নীতি ছাড়া এ ধরনের দেশবিরোধী চুক্তি সম্ভব নয়।
কমিটির সদস্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোস্তাক হোসেন খান বলেন, আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত করছে। তারা ভারতের আমলাদের ঘুস দিয়ে অনেক কাজ নিয়েছে-এমন অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে আদানির সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একজন আইনজীবীকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ওই আইনজীবী আদানির চুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, আরও অনিয়ম-দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে নতুন সরকার আদানির চুক্তি বাতিল করতে পারে। তবে এটি বাতিল করলে পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে আমদানির আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বন্ধ করেও দিতে পারে। তখন দেশে লোডশেডিং হবে। ওই সময়ে জনগণ ধৈর্য ধরতে পারলে ২৫ বছরের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে দেশকে বাঁচানো যাবে।
অস্বাভাবিক দামে বিদ্যুৎ ক্রয় : তদন্ত কমিটি ২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর সব চুক্তি যাচাই করেছে। এতে দেখা গেছে, বেরসকারি খাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ৪৫ শতাংশ এবং সৌর বিদ্যুতের দাম ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি নেওয়া হচ্ছে। এভাবে দেশের অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি করে গেছে পতিত সরকার। যেমন: ২০১৫ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান ছিল ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে এসে পিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ পিডিবিকে কিনতে হয় ১২ দশমিক ৩৫ টাকা। অথচ বিক্রি করে ৬ দশমিক ৬৩ টাকা। এখন বিদ্যুৎ খাতকে বাঁচাতে হলে দাম বাড়তে হবে ৮৬ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে ৪ গুণ। কিন্তু আইপিপিগুলোর বিল বেড়েছে ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ২০ গুণ। তিনি বলেন, চুক্তিগুলো যাচাই করলে দেখা যায়, বিশেষ আইনের নামে ক্রয় এবং চুক্তি প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে রাষ্ট্র দখলে রূপ নেয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০ থেকে ২৫ বছরের বাসা ভাড়ার মতো আইপিপিগুলোকে নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা, জ্বালানি এবং ডলারের ঝুঁকি থেকে আইপিপিগুলোকে রক্ষা করা হয়েছে। এ ধরনের চুক্তি জাতীয় স্বার্থের চেয়ে একটি সীমিত গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বড় কেন্দ্রে বড় দুর্নীতি : আদানি ছাড়াও সামিটের মেঘনাঘাট-২ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র সমসাময়িক অন্যান্য কেন্দ্রের চেয়ে দ্বিগুণ ব্যয় দেখিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি নিচ্ছে। একইভাবে তেলভিত্তিক সামিটের বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে। এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার (১৩২০ মেগাওয়াট) কেন্দ্র অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে। উল্লেখ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেশি ব্যয় দেখানো এবং সেই ব্যয় অনুমোদন করা গেলে ক্যাপাসিটি চার্জও বেশি পাওয়া যায়।
ড. জাহিদা বলেন, পিডিবি এখন বিদ্যুতের দাম পরিশোধের মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়েছে এবং এর ফলে অর্থনীতিতে ভর্তুকি, লোকসান ও বকেয়া বেড়েছে। এ অবস্থায় সরকারের লোকসান কমাতে হলে বিদ্যুতের ভোক্তারা উচ্চ ট্যারিফের মুখোমুখি হতে পারেন। তিনি বলেন, বিদ্যুতের ব্যয় বাড়ার কারণে ভিয়েতনাম, চীন, পাকিস্তান এবং ভারতের শিল্প খাতের তুলনায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়তে হবে, যা করা হলে দেশে শিল্পহ্রাসের মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হবে।
তদন্ত কমিটি সব চুক্তির (পিপিএ) তথ্য প্রকাশ, দরপত্রের মাধ্যমে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কার্যকর ও স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। কমিটি আরও জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বাতিল, সব চুক্তির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই অব্যাহত রাখা এবং সবচেয়ে বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার সুপারিশ করা হয়েছে।
১০ বছরের লোকসান চিত্র : জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী সরকার বেশি দামে কিনে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে। বিশেষ করে আইপিপি এবং আদানির বিদ্যুৎ কেনার পর বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পরিমাণ ব্যাপক বেড়েছে। জাতীয় কমিটির হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লোকসান ১ লাখ ৮ হাজার ১০২ কোটি টাকা। এই ১০ বছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। ২০১৪-২০১৫ সালে পিডিবির লোকসান ছিল ৫ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ সালে সেই লোকসান গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা।
২০২০-২০২১ সালে মূলত লোকসান বাড়তে শুরু করে। ওই বছরে পিডিবি লোকসান দেয় ১০ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। জাতীয় কমিটি আরও জানিয়েছে, ২০১৪-২০১৫ সালে ভর্তুকি দেওয়া হয় ৮ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। সেই ভতুর্কি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসে ২০২৪-২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এরপরও এখনো পিডিবির কাছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির পাওনা রয়েছে ৫৫ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।