Image description

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার প্রথম দিনের নির্বাচনি সভা শুরু করেন সিলেট থেকে। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে তিনি বলেন, ‘‘কেউ বেহেশতের টিকিট বিক্রির মাধ্যমে ভোট চাচ্ছে। নির্বাচনের আগেই তারা ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তারা কী করবে, সবাই বুঝে গেছে।’’ তিনি ‘কেউ’ বলে কাদের বুঝিয়েছেন সেটি স্পষ্ট করেননি। এদিন বিকালে রাজধানীতে জামায়াত তার জোটের শরিকদের নিয়ে প্রথম নির্বাচনি সভার আয়োজন করে।

মিরপুর-১০ নম্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে জামায়াত ইসলামীর এক নেতা বলেন, ‘‘আমি দেখতে পাচ্ছি—একটা বৃহৎ দলের প্রধানের বক্তৃতার বিষয়বস্তু শুধু জামায়াত ইসলামী। তিনি বলেছেন, জামায়াত ইসলামী নাকি জান্নাতের টিকিট বিক্রি করছে। আমি এই জনসভায় তাকে আহ্বান জানাচ্ছি—একটি উদাহরণ আমাদের সামনে পেশ করেন। বৃহৎ দল বলে তিনি কাকে স্বীকৃতি দিলেন, সেটা তিনি স্পষ্ট করে বলেননি।’’

প্রচারণার শুরুর দিন যার যার জনসভায় পারস্পারিক তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখা গেছে নেতাদের। তবে, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামায়াতের জনসভায় বক্তব্য রাখার সময় ‘বিএনপি’র নাম উল্লেখ করে সমালোচনা করেন। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, গণতন্ত্র টিকে থাকার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ তর্ক-বিতর্ক খুবই জরুরি।

প্রথম দিন তারেক রহমান সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে জনসভা ও পথসভায় বক্তৃতা করেন। রাজধানীতে এনসিপি তিন নেতার মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে প্রচারণা শুরু করে। বিকালে জামায়াতের জনসভায় জোটের শরিক হিসেবে উপস্থিত হন নাহিদ ইসলাম। সেখানে বিএনপির নাম না নিয়ে তারেক রহমানের ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং সেটার টাকার উৎস ও প্রদান প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করা হয়। সমাবেশে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে চাঁদাবাজির অভিযোগও আনা হলো। বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ‘‘একটি দল সরকারি ট্যাক্সের বাইরে বেসরকারি ট্যাক্স নেয়।’’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সমালোচনা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা-১৫ আসনের উদ্যোগে মিরপুরে আয়োজিত জনসমাবেশে তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হবে। অন্য কোনও প্ল্যান কাজে আসবে না। নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছ থাকতে হবে। কোনও দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। আমরা নির্বাচন কমিশনকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমরা মাঠে আছি। কোনও অন্যায় সহ্য করা হবে না।’’

সিলেট শেষ করে দুপুরে মৌলভীবাজার এলাকার আইনপুরে নির্বাচনি পথসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে, এই সরকারের উপদেষ্টাদের অনুরোধ করবো— বিএনপির পক্ষ থেকে, লাখো জনতার পক্ষ থেকে—তাদের প্রটোকল দরকার হলে তিন ডাবল করে দেন। কারণ তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং মানুষ এটা জানতে পেরেছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘মানুষ তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হচ্ছে। আমরা চাই না মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের কিছু করে বসুক। সে জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে—তাদের প্রটোকল তিন গুণ করে দেন। বিএনপিকে যা নিরাপত্তা দিয়েছেন, তার তিন গুণ করে দিন তাদের।’’ কাদের বিষয়ে তিনি সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছেন, তা স্পষ্ট করে না বললেও জনগণ হর্ষধ্বনি করে বক্তব্যে সাড়া দেন।

বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ফ্যামিলি কার্ডের সমালোচনা করেন জামায়াত আমির ড. শফিকুল ইসলামও। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘কারও হাতে খয়রাতি অনুদান তুলে দিয়ে তাদের অপমান করতে চাই না। আমাদের যুব সমাজকে সম্মানিত করতে চাই। আমরা কোনও ধরনের কোনও কার্ডের কথা বলছি না। দুই হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনও সমস্যার সমাধান হবে? আমার ভাই নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তাতেও (দুই হাজার টাকায়) আবার ভাগ বসিয়ে দেওয়া হবে। খাজনা আগে তারপর অন্যটা। (এই কার্ড) কাল্পনিক চরিত্রের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এ বৈষম্যগুলো কি আমরা আগে দেখতে পাইনি?’’

টাকা কোথা থেকে আসবে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘‘টাকার সোর্স তো জনগণ, জনগণের ট্যাক্সের টাকা। ট্যাক্সের বাইরে কিছু বেসরকারি ট্যাক্স আছে। প্রত্যেকটা মুদির দোকানে, রাস্তার হকারের কাছে, এমনকি রাস্তার পাশে বসে যে ভাইবোনটি ভিক্ষা করেন, তার কাছ থেকেও একটা ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্সের টাকা আমরা আমাদের জনগণের হাতে তুলে দিতে চাই না।’’

একই জনসভায় জামায়াত ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ‘’১৭ বছর পর লন্ডন থেকে একজন মুফতি এসেছেন আমাদের দেশে। তিনি আমাদের মুসলমানদের ‘কুফরি’ আখ্যা দিচ্ছেন। আমরা একটা নতুন বাংলাদেশ চাই। যে রাজনীতিবিদরা ভারতের আশীর্বাদ নিয়ে দেশ শাসন করতে চান, এমন শাসক আমরা চাই না। আমি দেখতে পাচ্ছি একটা বৃহৎ দলের প্রধানের বক্তৃতার বিষয়বস্তু শুধু জামায়াত ইসলামী। অন্য কোনও কথা তিনি বলেন নাই, সিলেটের বক্তৃতায় পড়লাম। তিনি বলেছেন, জামায়াত ইসলামী নাকি জান্নাতের টিকিট বিক্রি করছে। আমি এই জনসভায় তাকে আহ্বান জানাচ্ছি—একটি উদাহরণ আমাদের সামনে পেশ করেন।’’

তিনি তারেক রহমানের সিলেটের জনসভাকে ইঙ্গিত করে কথাটি বলেছেন—যেখানে তারেক বলেছেন, ‘‘সবকিছুর মালিক আল্লাহ। কিন্তু কেউ কেউ বেহেশতের টিকিট বিক্রির মাধ্যমে ভোট চাচ্ছে। নির্বাচনের আগেই তারা ঠকাচ্ছে। নির্বাচনের পরে তারা কী করবে সবাই বুঝে গেছে। যারা বলছেন—অমুককে দেখেছেন, তমুককে দেখেছেন, তাদের ৭১ সালেও দেশের মানুষ দেখেছেন।’’

‘এ ধরনের তর্ক-বিতর্ক ভালো’ উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘যদি এই তর্কযুদ্ধ এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভালো। পরস্পরের কাজের সমালোচনা করবে, এর বেশি কিছু যেন না হয়। কথার উত্তাপ-উত্তেজনা যেন সহিংসতার রূপ না নেয়।’’

তিনি বলেন, ‘‘প্রত্যেকের মধ্যে যদি সহনশীলতা থাকে, তাহলে তর্ক রাজনীতির জন্য ভালো। সহনশীলতার বাঁধ যেন ভেঙে না যায়।’’

জামায়াত ও বিএনপি তাদের প্রথম নির্বাচনি সভায় বিতর্কে জড়িয়েছে। এটাকে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক মনে কিনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একেকটা দল একেকটা পলিটিক্যাল এজেন্ডা নিয়ে নেমেছে। কারও ইশতেহার, কারও কর্মসূচি নিয়ে যদি কেউ বিতর্ক করে, সেটা তো রাজনৈতিকভাবে রাজনীতিবিদরা বলতে পারেন। ইতিবাচক সমালোচনা তো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আলোচনা-সমালোচনা যদি না করেন, এই আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়েই তো ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন কে ভালো কে মন্দ।’’

প্রসঙ্গত, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (জামায়াত), জাতীয় পার্টি, নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য ইসলামি ও বামপন্থি দল আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, সারা দেশের ২৯৮টি সংসদীয় আসনে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। একই দিনে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।