দেশের রাজনীতিতে পেশাদার রাজনীতিবিদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। নতুন নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণির মানুষজন আসছেন নির্বাচনে প্রার্থিতা করতে। গত পাঁচটি নির্বাচনের চিত্র বিশ্লেষণ করে এমনটিই দেখেছে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
টিআইবি বলেছে, রাজনীতিতে অর্থ মূল পুঁজি, এটাই তার প্রমাণ এবং ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আসার মূল কারণ এটি। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনে শিক্ষিত প্রার্থীদের সংখ্যাও বাড়ছে- এমন তথ্যও উঠে এসেছে টিআইবি’র পর্যবেক্ষণে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ পরিমাণ শিক্ষিত প্রার্থীর অংশগ্রহণের রেকর্ড রয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনী হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য সামনে এনেছে টিআইবি।
বৃহস্পতিবার টিআইবি কার্যালয়ে নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানায় সংস্থাটি। সেখানে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ গত পাঁচটি নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে একটি কেওয়াইসি ড্যাশবোর্ডসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি।
সংস্থাটি বলছে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী মূল পেশা বিবেচনায় ব্যবসায়ী। আইন ও শিক্ষক পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন যথাক্রমে ১২ দশমিক ৬১ এবং ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রার্থী। এরপরেই রয়েছেন চাকরিজীবী ও কৃষিজীবী পেশার প্রার্থীরা। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রার্থী।
ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৭৬.৪২ শতাংশ প্রার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এর মধ্যে স্নাতক ২৮.৩৭ শতাংশ, সবচেয়ে বেশি স্নাতকোত্তর ৪৭.৯৮ শতাংশ। আর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন ৮.৯৪ শতাংশ, মাধ্যমিক ৬ শতাংশের কিছু বেশি প্রার্থী। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত চার নির্বাচনের ২০০৮ সালে ৭১ দশমিক ২৩ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৭১ দশমিক ৯১ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬৭ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ স্নাতক বা এর বেশি শিক্ষাগত প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
শীর্ষ ১০ কোটিপতির ৭ জন বিএনপি’র
এবারের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে শীর্ষ ১০ জন কোটিপতি প্রার্থী শনাক্ত করেছে টিআইবি। সেখানে সাতজন প্রার্থী বিএনপি’র এবং বাকি ৩ জন প্রার্থী স্বতন্ত্র। ৫৯৯ দশমিক ৭ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. আমিনুল ইসলামের। তিনি কোটিপতির তালিকায় প্রথমে রয়েছেন। দ্বিতীয় কোটিপতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এ কে একরামুজ্জামানের ৪১৮ দশমিক ১ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। অন্যদিকে, ২৭ জন শতকোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদশালী প্রার্থীদের মধ্যে ১৮ জন প্রার্থীই বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. আমিনুল ইসলামের ৬১৯ দশমিক ৯০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফেনী-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু। যার ৬০৭ দশমিক ৫৭ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। ২৭ জনের তালিকায় বাকি ৯ জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী।
জমির মালিকানা ও বৈধতার সীমা ১০০ বিঘা হলেও নির্বাচনে প্রার্থিতা করা অনেক প্রার্থীরই এর বাইরে সম্পদ আছে বলে দেখিয়েছে টিআইবি। তবে অতিরিক্ত সম্পদ থাকলেই প্রার্থিতা বাতিল বা এ সংক্রান্ত কোনো আইন নেই বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জমির মালিকানার নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন হলে প্রার্থিতা বাতিল হবে- এ ধরনের কোনো আইন আছে বলে আমরা জানি না। কিন্তু রাষ্ট্রের এখানে দায়িত্ব আছে যে, যারা সীমা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হয়েছে, রাষ্ট্র তাদের অতিরিক্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ভূমিহীনদের দান করা উচিত।
নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর অংশগ্রহণ বেড়েছে
এবার সংসদ নির্বাচনে রেকর্ড পরিমাণ ইসলামী দলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যা আগের সব নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণ করে টিআইবি দেখেছে, নবম থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে এবার অর্থাৎ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ প্রার্থী ইসলামী দলের প্রার্থী অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর প্রার্থী ছিলেন ২২ দশমিক ২১ শতাংশ। মাঝে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ১ দশমিক ১০ শতাংশ ইসলামী দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন।
নির্বাচনী হলফনামায় ২ জন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের কথা উল্লেখ করেননি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে দু’জন প্রার্থী হলফনামায় তাদের দ্বৈত নাগরিকত্বের কথা উল্লেখ করেননি। তবে তারা নির্বাচনে প্রার্থিতা করছেন। টিআইবি তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্রের ভিত্তিতে এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে টিআইবি জানিয়েছে, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে ঘোষণা দেয়া বাধ্যতামূলক এবং বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণও দাখিল করতে হয় হলফনামার সঙ্গে। এবারের ২১ জন প্রার্থী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং তা ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন হলফনামায়। কিন্তু কমপক্ষে দুইজন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা সত্ত্বেও হলফনামায় উল্লেখ করেননি। টিআইবি’র হস্তগত তথ্য বলছে, তারা বৃটিশ নাগরিক ছিলেন।