ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচার চলছে বৃহস্পতিবার থেকে। ভোটের প্রচারণায় ভোটারদের মাঝে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ আগেই উঠেছে। প্রার্থীরা এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী অভিযোগ তুলেছেন। অবশ্য এমন অভিযোগ আমলে নিয়ে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সংস্থাটির সূত্র বলছে, এরই মধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলকে জরিমানা করা হয়েছে। তা ছাড়া সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে অন্তত চারটি দলকে। এদিকে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের অভিযোগ নজরে এসেছে ইসি’র। বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রমাণও পেয়েছে সংস্থাটি। ইসি বলছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ভোটারদের মাঝে উপহার বিতরণের ক্ষেত্রে সতর্ক করা হয়েছে প্রার্থীদের। এতে জানানো হয়, নির্বাচনী প্রচারণার আড়ালে কতিপয় ব্যক্তি কর্তৃক ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন ২০১০ অনুযায়ী, অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বহন কিংবা হস্তান্তর করা যাবে না। এ ছাড়া ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’-এর বিধি-৪ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী কিংবা তার পক্ষে অন্য কেউ নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রকার চাঁদা, অনুদান বা উপহার প্রদান করতে বা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না। এসব কার্যক্রম বিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নির্বাচন কমিশন সকল নাগরিক ও সংগঠনকে উল্লিখিত কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। উল্লেখ্য গত রোববার, বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, দলটির প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াতের প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের জাতীয় পরিচয় পত্র ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছেন।
এ বিষয়ে সন্ধ্যায় ইসি’র সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ভোটের প্রচারের আড়ালে কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমার কাছে এ মুহূর্তে তালিকাটা নেই। তাই সংখ্যাটাও নেই। তবে অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে জরিমানাও করা হয়েছে। আবার অনেক দলকে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছি।
এদিকে ভোটের মাঠে আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণে রাখতে মুঠোফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার বিকালে সংস্থাটির কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ভোটের আগে অস্বাভাবিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে কমিশনের তরফে। কোনো ঘন ঘন একাধিক নম্বরে একসঙ্গে অনেকগুলো লেনদেন করে সেগুলোর ওপর নজরদারি করার বিষয়ে জোর দেয়া হয়। এ বিষয়ে সন্ধ্যায় কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা পুরোপুরি বন্ধ না করে সীমিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি, এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, সিআইডি, বিকাশ, রকেট নগদ ও উপায়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা।
আরও যা জানালেন সচিব: গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখতে আসবেন প্রায় ৫০০ বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক। এদের মধ্যে আমন্ত্রিতদের রাখা হবে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ইসি সচিব বলেন, এখান থেকে আমরা বিভিন্ন অর্গানাইজেশনের ৮৩ জনকে ইনভাইট করেছি। তাদের মধ্যে ৩৬ জন আমাদের কনফার্ম করেছেন। আর পাঁচটি সংস্থা থেকে রিগ্রেট করা হয়েছে। এখনো কনফারমেশনের আরও কিছু বাকি আছে।
তিনি বলেন, আমাদের দু’টি পদ্ধতি ছিল। একটি আমরা স্ব-উদ্যোগে ইনভাইটেশন করেছি। আরেকটি ছিল জার্নালিস্ট ও অবজারভারদের জন্য ওপেন ইনভাইটেশন। এ পর্যন্ত ৫০ জন সাংবাদিক আমাদের কাছে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন যে তারা এখানে এসে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে চান। ৭৮ জন অবজারভার ও ৫০ জন সাংবাদিক আসতে চান। এটি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। হয়তো দেখা যাবে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পর এই সংখ্যাটি আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, তাদের ভিসা প্রাপ্তির বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে আসতে বলেছি। পয়েন্ট অব ডিপারচার থেকে ভিসা নিয়ে আসতে বলেছি।
আর কেউ যদি তা না পারেন, সে ক্ষেত্রে অন-অ্যারাইভালে এখানে এয়ারপোর্টে ব্যবস্থা থাকবে। এখানে একটি হেল্প ডেস্ক থাকবে। পাশাপাশি আমাদের আমন্ত্রিতদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রাখা হবে। হোটেলে হেল্প ডেস্ক ও মিডিয়া সেল থাকবে। সেখানে বিভিন্ন পয়েন্টে কো-অর্ডিনেশনের ব্যবস্থা করা হবে। তাদের সঙ্গে অফিসার থাকবেন ইত্যাদি।
তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৫৬ জন প্রতিনিধি অবস্থান করছেন। এই সংখ্যাটি পরবর্তীতে প্রায় তিনশ’র কাছাকাছি যাবে বলে আমাদের ধারণা দেয়া হয়েছে। কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট থেকে আমরা ইনভাইট করেছিলাম, তারা ১০ জন আসবেন। তুরস্ক থেকেও আমরা ইনভাইট করেছিলাম, তবে তারা সম্ভবত ৯ জন আসবেন। অনেক জায়গায় আমাদের যদি ভিসা ফ্যাসিলিটি বা মিশন না থাকে, তাহলে তারা যেন অন-অ্যারাইভালে এসে কোনো অসুবিধায় না পড়েন, সে ব্যবস্থা থাকবে। আমাদের ধারণা প্রায় ৫০০ বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক আসবেন।