নানা জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে তিন বছরেরও বেশি সময় আগে আওয়ামী লীগ শাসনামালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পেয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তবে এটি হুট করে ঘটা কোনো ঘটনা নয়।
সরকারের সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সাহাবুদ্দিনকে পদে বহাল রাখা হবে কি না, তা নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। বিষয়টি তিনি নিজেও জানতেন। শেষ পর্যন্ত অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তার পদত্যাগ—বিএনপি সরকার ও রাষ্ট্রপতি, উভয় পক্ষের জন্যই একটি সম্মানজনক সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে।
বিএনপি ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন বলেও নিশ্চিত করছেন নেতারা। এর ফলে একদিকে নতুন সরকার রাজনৈতিক সংঘাত বা সাংবিধানিক সংকট এড়াতে সক্ষম হয়েছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিও অভিশংসনের মতো বিতর্কিত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি না হয়ে মর্যাদাপূর্ণভাবে দায়িত্ব ছাড়ার সুযোগ পেয়েছেন।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরের বছরগুলো সাহাবুদ্দিনের জন্য সহজ ছিল না। পরের বছরের ৫ আগস্ট তীব্র গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর শূন্যতার মধ্যে তিনি সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথের আয়োজন করেন। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের যাত্রা শুরু হয়।
তবে এই সরকারের আমলে সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে। পরে বিএনপির জোরালো অবস্থানের কারণে সে পথে আর হাঁটেনি সরকার। সাহাবুদ্দিনও তার পদত্যাগপত্রে সেই ঘটনাই লিখেছেন, ‘আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’
রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার দাবিও করেন তিনি। আর পদত্যাগপত্র পাওয়ার পর স্পিকারও তার প্রশংসাই করেন। বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি (সাহাবুদ্দিন) মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি সবসময়ই সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন।’
গত বুধবার প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের একটি বক্তব্যের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। সফর সংক্ষিপ্ত করে থাইল্যান্ড থেকে একদিন আগেই দেশে ফেরেন স্পিকার। শুক্রবার দুপুরে তিনি দেশে ফিরলে বিকাল ৪টার দিকে সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে এর আগের কয়েক ঘণ্টায় হয়েছে নানা নাটকীয়তা।
সকালে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের খবরকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন এবং এ ধরনের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান। দুপুরে দেশে ফিরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে তিনিও অন্যদের মতো শুনেছেন।
পদত্যাগ করার একঘণ্টা আগে বেলা ৩টায় রাষ্ট্রপতি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তার পদত্যাগের সংবাদ গুজব না। তিনি পদত্যাগ করতে অটল।
রাষ্ট্রপতি কেন পদত্যাগ করেছেন, এই প্রশ্নে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের চাপ বা অনাস্থা নেই। গুরুতর অসুস্থতা দেখিয়ে ব্যক্তিগত কারণে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন। এটি তার সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার।’
রাষ্ট্রপতিও তার পদত্যাগপত্রে অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য অনেক রোগের পাশাপাশি অটোনমিক নিউরোপ্যাথি নামে একটি জটিল রোগের কথা জানিয়েছেন। এই রোগের কারণে তিনি মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়েন।
স্পিকারও বলেন, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন।
পদত্যাগের পর মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন ছেড়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে গুলশানে তার বাসায় নতুন টেলিফোন লাইন স্থাপনের খবর এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য টাইমসকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে বিএনপির কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বৃহস্পতিবারই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু স্পিকার চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে থাকায় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ করতে তার দেশে ফেরার অপেক্ষা করতে হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এই হিসাবে তার আরও প্রায় দুই বছর দায়িত্বে থাকার কথা ছিল।
সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন চাইলে মূলত দুটি সাংবিধানিক পথ খোলা ছিল।
প্রথমটি হলো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ। রাষ্ট্রপতি যদি নিজ উদ্যোগে পদত্যাগ করেন, অথবা নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর পদত্যাগে সম্মত হন, তাহলে সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।
দ্বিতীয় পথ হলো অভিশংসন। এ ক্ষেত্রে নবগঠিত সংসদে আনুষ্ঠানিক অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে, তাত্ত্বিকভাবে বিএনপির সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার মতো ভোট থাকবে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায় যেতে হয়নি বিএনপিকে।
তবে সংবিধান অভিশংসনের সুযোগ দিলেও এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদক্ষেপ। বিশেষ করে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, যেখানে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক, সেখানে অভিশংসনকে সাধারণত সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গভবনের একটি সূত্র জানিয়েছিল, সরকার যদি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের অনুরোধ জানায়, তবে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। টাইমস সে সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টিকে ‘সংবেদনশীল’ উল্লেখ করে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে বিএনপির ভেতরে এ বিষয়ে ভিন্নমত ছিল। দলের একাংশের নেতারা চেয়েছিলেন, প্রচলিত রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। এরপর তিনি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন, যাতে নতুন সংসদ পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারে।
আরেকটি অংশ চেয়েছিল—নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের পর বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতিকে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে দেওয়া হবে কি না।
সে সময় দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিশংসনের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিশ্চিত করা রাজনৈতিকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। অভিশংসনের পথ রাজনৈতিক বিভাজন এবং ভাবমূর্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে বলেও আশঙ্কা ছিল তাদের।
তবে দলের অন্য একটি অংশ সতর্ক করে বলে, মেয়াদ শেষ হতে যখন দুই বছরেরও কম সময় বাকি, তখন রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হলে নতুন সরকারের ঘোষিত ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও এর সাংবিধানিক ও প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা, শপথ পড়ানোসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতি পালন করেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীরও প্রধান। আর ভিন্ন দলের কেউ রাষ্ট্রপতি থাকা এ কারণেই যে কোনো সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে।