Image description

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ফেরা-না-ফেরা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও আপাতত সরকারের দিক থেকে কোনো ধরনের ছাড় পাচ্ছে না দলটি। শিগ্গিরই রাজনীতিতে দলটির ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ফেরা দূরের কথা, বরং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতাকে হত্যাসহ সাড়ে ১৫ বছরে বিরোধী মতের হাজার হাজার মানুষকে গুম-খুনের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে দলটি। এরই মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য থেকেও তেমনই আভাস মিলেছে। রোববার চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দলটি নিষিদ্ধ হবে। এর আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিচারের বিষয়ে শনিবার কড়া বার্তা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, দলটিকে শিগ্গিরই বিচারের মুখোমুখি করা হবে। সংবিধানের ৪৭ আর্টিকেল অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আইসিটি অ্যাক্টে রাজনৈতিক দল-সংগঠনের বিচার করা যাবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেখানে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না। পরে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এ সংক্রান্ত আদেশে কিছু সংশোধনী এনে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাশ করা হয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীরা বিভিন্ন উসকানি দিয়ে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। জুলাই আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দোসররা আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনা ভারতে বসে বাংলাদেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টের জন্য অনলাইনে উসকানিমূলক কথাবার্তা বলছেন। তিনি এবং তার দলের সিনিয়র অনেকেই দেশে ঢুকে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ আওয়ামী শিবিরের বাইরের লোকজনকে নিঃশেষ করার হুমকি দিচ্ছেন। সেই উসকানি পেয়ে দেশের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা নিষিদ্ধ দলটির অনেকেই কোথাও কোথাও মিছিল বের করার অপচেষ্টা করে। কোথাও হামলাও চালায়। কোনো কোনো এলাকায় দলের বন্ধ কার্যালয় খুলে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়। তারা পরিকল্পিতভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ছক আঁকে। তাদের ‘কালচারাল’ দোসররা নানাভাবে জুলাইকে বিতর্কিত করার নামে আওয়ামী লীগকে মাঠে আনার পাঁয়তারা শুরু করে।

এমন বাস্তবতায় সরকার দেশের জনগণের জানমাল রক্ষায় হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানা যায়। এরই অংশ হিসাবে দলটির বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠেন সংশ্লিষ্ট সবাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, চব্বিশে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর, গণহত্যার পরও আজ পর্যন্ত সেই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কোনো রকমের অনুশোচনা নেই। তাদের মধ্যে দোষ স্বীকারের ইতিহাসই নেই। তারা উলটো বিদেশে বসে বাংলাদেশে এখন নাকি গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র করছে! আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে, দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যই আমাদের দলের কথা। বিএনপি জনগণের প্রত্যাশিত একটি রাজনৈতিক দল। জনগণ যেটা চায়, সরকার তাই করবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক নেতা বলেন, বিএনপি কারও রাজনীতি বন্ধ করতে চায়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই সুযোগ সৃষ্টি না করে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করেছে। তারা প্রতিশোধের হুমকি দিচ্ছে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যার পরও তাদের ন্যূনতম অনুশোচনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, এ দেশের জনগণ এখন হার্ডলাইনে আছে। জনগণের মনে যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে, সেটিকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এই ফ্যাসিবাদী শক্তি যদি আবারও দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করে, জনগণ তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠিন ও তীব্র অবস্থান নেবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব যুগান্তরকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগকে দল হিসাবে বিচার করার বিষয়ে যা বলেছেন, শুরু থেকেই এটি আমাদেরও দাবি ছিল। তার সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলতে চাই, জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসানুল হক ইনুকে মাত্র ১০ বছরের সাজা আমরা মেনে নিতে পারছি না। ইনু পুরো গণহত্যার পরিকল্পনাকারীদের একজন। সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখের বক্তব্য এবং সরকারের কাজের বাস্তব প্রতিফলনের মধ্যে যেন বৈপরীত্য তৈরি না হয়, সেটি আশা করব।

জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে আওয়ামী লীগকে নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনার টেবিলে কিছুটা ইতিবাচক জল্পনা-কল্পনা ছিল। কিন্তু গত তিন মাসে আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির একাধিক নেতার বক্তব্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উলটে যায়। শেখ হাসিনা তার বিভিন্ন বক্তব্যে দেশে ফিরে আসা এবং প্রতিশোধমূলক কথা বলেছেন; যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমনকি বিএনপিকেও কোনো প্রকার ছাড় দিয়ে কথা বলেনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি। বর্তমান সরকারকে ‘ভুয়া ইলেকশনের’ মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার কথাও বলেছে তারা।

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে দেশে ফেরা নিয়ে ষড়যন্তমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে হত্যার ঘটনায় অনুশোচনা প্রকাশ না করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও দলের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা বদলা নেওয়ার হুমকি দেন।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা বলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সব বাধা ছিন্ন করে এ বছরই দেশে ফিরে আসবেন বলে তিনি হুংকার দেন। দাম্ভিকতা দেখিয়ে বলছেন, ‘জেলখানা রেডি রাখুন, বিমান পাঠান, আমি আসছি।’

ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে বলেছেন, নেত্রীকে (শেখ হাসিনা) দেশে ফেরাতে যা করা দরকার, সব করা হবে। এর জন্য দেশে ও দেশের বাইরের নেতৃবৃন্দকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অজ্ঞাত স্থান থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছেন, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ দুটোই রাজনীতিতে খুব শীঘ্রই সক্রিয় হবে।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে আলোচনা ওঠে যে, আওয়ামী লীগকে ছাড় দিয়ে কোনো লাভ নেই। দলটি সাড়ে ১৫ বছরের রাজনীতিতে তাদের ভুল বা অপরাধও স্বীকার করেনি। এমনকি ‘রিফাইন্ড’ বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ বলতে যা বোঝায়, দলের ভেতরে তেমন কোনো সংশোধনের আভাসও মেলেনি। দলের পুরোনো কাঠামো আগের মতোই রয়ে গেছে। ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দলটি এমন এক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করে যাতে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন করতে হয়।

আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও এনসিপি সরকার এবং বিএনপির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে আসছিল। দলগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে বিএনপি। কিন্তু গত দুদিনের পরিস্থিতি বলছে, সরকার আওয়ামী লীগের ব্যাপারে ছাড় দিতে নারাজ।

এদিকে আওয়ামী লীগ যে ভুল করছে এবং সঠিক পথে নেই-তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে সোহেল তাজের বক্তব্য থেকেও সেটি সামনে আসে। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘একজন মানুষের ইগো, অহংকার যে একটি দেশ এবং দলকে ধ্বংস করতে পারে তার প্রমাণ হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পরিবার। গণহত্যা, গুম, খুন, দুর্নীতি করে, গণতন্ত্র কবর দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অপব্যবহার করে, দেশ এবং মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে ছাত্র-জনতার ঝাঁটাপেটা খেয়ে পালিয়ে গিয়েছে। দুর্নীতি, লুটপাট করে লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে সেই টাকার পাহাড়ে বসে আবার এখন ফেরার কথা বলে আওয়ামী লীগের নিরীহ নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলবে-এটা তাদের সঙ্গে প্রতারণা আর ভণ্ডামি করা ছাড়া কিছু না। আত্মসমালোচনা এবং আত্মোপলব্ধি না করলে অদূরভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঠে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন প্রথমদিকে বিএনপি কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে। অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত দল আওয়ামী লীগ এবং ব্যক্তি-উভয়কেই যথাযথ বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যদি কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়, তাকে অবশ্যই কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গবেষক আবুল কাশেম ফজলুল হক রোববার মারা যান। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তিনি বলেছিলেন, জুলাই গণহত্যাসহ গুম-খুনের ঘটনায় দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে দেশের জনগণ বিচারের কাঠগড়ায় দেখতে চায়।

দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, তবে অনেকেই কারাগারে আছেন; যারা কোনো অপরাধ বা সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাদের রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখা উচিত।