একটি মাত্র গোপন কোড ‘শাপলা’ বলতে না পারায় হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভেস্তে গেছে মালয়েশিয়াগামী ৭১ যাত্রীর মানব পাচার পরিকল্পনা। শনিবার রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে টুরিস্ট ভিসার আড়ালে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’র মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার সময় বোর্ডিং গেটে ধরা পড়েন তারা। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন ও সিভিল এভিয়েশনের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা মানব পাচার সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য আবারও প্রকাশ্যে এসেছে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, বোর্ডিং গেটে কোডের গরমিল হওয়ায় প্রথমে পাঁচ যাত্রীকে আটকে দেওয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে একই সিন্ডিকেটের আরও ১০ জন তড়িঘড়ি করে বিমানবন্দর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু গোয়েন্দা জালে তারাও আটকা পড়েন। এদিকে চেক-ইন কাউন্টারে অপেক্ষমাণ বাকি ৫৬ যাত্রীও বোর্ডিং পাশ না নিয়েই একে একে সরে পড়েন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটে তাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ছিল।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগিব সামাদ যুগান্তরকে বলেন, ঘটনাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা জড়িতদের শনাক্ত এবং পুরো নেটওয়ার্ক উদ্ঘাটনে কাজ করছেন।
সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা ‘বডি কন্ট্রাক্ট’র মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের বিষয়টি আগেই জানতে পারেন। এরপর থেকে সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু হয়। সন্দেহজনক যাত্রীদের পাসপোর্ট ও ভিসা পুনরায় যাচাইয়ের সময় একে একে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এতে ২৮৩ যাত্রীর ভ্রমণের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৭১ জন যেতে পারেননি। এর মধ্যে বোর্ডিং গেট থেকে ১৫ জনের পাসপোর্ট ও ভিসার তথ্যের অসঙ্গতি ধরা পড়ায় তাদের অফলোড করা হয়।
যাত্রা বাতিল হওয়া ৭১ জনের মধ্যে একজনের পাসপোর্ট ও এয়ার টিকিটের কপি যুগান্তরের হাতে এসেছে। টিকিট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভার্চুয়াল এয়ার ট্রাভেলস নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এটি ইস্যু হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পল্টনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী ও কথিত ট্রাভেল এজেন্ট হারুনের মাধ্যমে এসব যাত্রীর মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ (ওয়ার্ক পারমিট) কার্যত বন্ধ থাকায় টুরিস্ট ভিসার আড়ালে তাদের পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হচ্ছিল একটি নির্দিষ্ট গোপন কোড ‘শাপলা’। কিন্তু বোর্ডিং গেটে সেই কোড বলতে না পারায় ভেস্তে যায় পুরো মানব পাচার পরিকল্পনা।
এ ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, ভিসায় গুরুতর অসঙ্গতি থাকার পরও কীভাবে এসব যাত্রী চেক-ইন ও ইমিগ্রেশনের একাধিক স্তর নির্বিঘ্নে পার হয়ে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। একাধিক সূত্রের দাবি, চেক-ইন কাউন্টারে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের ভিসা ‘ভেরিফায়েড’ হিসাবে গ্রহণ করা হয়। এরপর ইমিগ্রেশন থেকেও বিদেশ যাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ নামে পরিচিত একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র অর্থের বিনিময়ে জাল বা ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্রধারী ব্যক্তিদের বিমানবন্দরের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন ধাপ পার করিয়ে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। এ কাজে বিমানবন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাইরের দালাল চক্র জড়িত। সাম্প্রতিক কয়েকটি গোয়েন্দা তদন্তেও এমন একটি চক্রের অস্তিত্ব এবং বিমানবন্দরের ভেতরের কয়েকজনের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ‘উত্তরা’, ‘সিলেট’, ‘চশমা’, ‘একাশি’, ‘নদী’, ‘শাপলা’ ও ‘বিমান’ এ ধরনের গোপন কোড ব্যবহার করে দালাল চক্রের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাউন্টারে যাত্রী পাঠানো হয়। এরপর তাদের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স এবং এক্সিট গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়।
যুগান্তরের হাতে আসা একটি গোপন তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে বিদেশ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে (ডিপোর্টেড) দেশে ফিরেছেন ২২ হাজার ৩৭২ জন বাংলাদেশি। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৭২৮ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যাদের বড় একটি অংশ মানব পাচারের শিকার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে মানব পাচার চক্রে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১১ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং ৯ জনের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের একাধিক ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবল। এতে সিভিল এভিয়েশনের একজন অ্যারোড্রাম অপারেটরের নামও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চলতি বছরের এপ্রিলে প্রতিবেদনটি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (এসবি) জমা দেওয়া হয়।
এর আগে ৩০ মার্চ এক অভিযানে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মানব পাচারে জড়িত সিভিল এভিয়েশনের অ্যারোড্রাম অপারেটরের আব্দুল বারী মোল্লাকে আটক করা হয়। সরকারি চাকরির আড়ালে তার নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছে মানব পাচার চক্র। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই চক্র ওমরাহ ভিসায় যাত্রীদের প্রথমে সৌদি আরব পাঠায়। পরে কাতার, মিসর ও সিরিয়া হয়ে নৌপথে ইতালি নেওয়া হয়। এছাড়া ভারত, শ্রীলংকা ও দুবাই হয়ে একই রুটেও মানব পাচার করা হয়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা না গেলে বিমানবন্দরগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি এয়ারলাইন্স ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থাও কমে যেতে পারে। তাই জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এসএম লাবলুর রহমান বলেন, যেহেতু তদন্ত প্রতিবেদনে বারী মোল্লার নাম এসেছে। তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে।