Image description

নারায়ণগঞ্জে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে সিজান (২৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি ভিডিও যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে শহরজুড়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। 

ভাইরাল হওয়া মারধরের ভিডিওতে দেখা গেছে, বিদ্যুতের খুঁটিতে রশি দিয়ে দুই যুবককে বেঁধে স্টিলের পাইপ ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করছেন কয়েকজন ব্যক্তি। এ সময় সিজানের পাশে অনিক নামে আরেক যুবককে মারধর করতে দেখা যায়।

অপর আরেক ভিডিও তে দেখা যায়, ঘটনার পর আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠনের সহ-সভাপতি ও আল ফালাহ মসজিদের ইমাম মুফতি কাউসার আহমেদ কাসেমী হ্যান্ডমাইকে বক্তব্য দিয়ে বলেন, ‘মারছে কে? জনগণ মারছে। জনগণ যদি কোন কুত্তাকে মেরে ফেলে তার কোনও অন্যায় হবে? তার কোনও মামলা হবে? কোনও মামলা-হামলা কিচ্ছু হবে না।’

এদিকে এ ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সিজানের সহযোগী অনিকের একটি ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। সেই ভিডিও তে দেখা যায়, অনিক নিজ মুখে মোবাইল ছিনতাই ও মোবাইল বিক্রির টাকার ভাগ সিজানকে দিয়েছে বলে স্বীকার করেছে।

নিহতের স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় স্থানীয় মসজিদের ইমাম কাউসার আহমেদ কাসেমী যুবকদের নিয়ে আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠন নামে মাদক-সন্ত্রাসবিরোধী একটি সামাজিক সংগঠন গঠন করেন। শনিবার রাতে আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠনের ৩০ থেকে ৪০ জন সদস্য সিজানের বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলে তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর মাসদাইর মোড়ে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে ও শারীরিক নির্যাতন করে জিসানকে গুরুতর আহত করেন তারা। এক পর্যায়ে সিজান অচেতন হয়ে পড়লে ওই অবস্থায় তাকে পরিবারের কাছে তুলে দিয়ে চলে যান সংগঠনের সদস্যরা। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় শহরের খানপুর ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আর সিজানের সহযোগী অনিককে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

নিহত সিজান পশ্চিম মাসদাইর এলাকার ইউনুছ ওরফে ইন্নু মিয়ার ছেলে। এ বিষয়ে ইউনুছ মিয়া বলেন, স্থানীয় মসজিদের ইমাম কাউসারের নেতৃত্বে আল ফালাহ সংগঠনের সদস্যরা আমার ছেলে সিজানকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে বেধড়ক পিটিয়ে পা ভেঙে দেয়। এ সময় আমার ছেলে গুরুতর আহত হলে তার হাতের বাঁধন খুলে দেয়। আমাদেরকে চিকিৎসা করানোর কথা বলে তারা চলে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠনের সহ সভাপতি ও আল ফালাহ মসজিদের ইমাম মুফতি কাউসার আহমেদ কাসেমী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত ৩-৪ দিন আগে ইমন নামের এক যুবকের কাছ থেকে সিজান মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এ নিয়ে নালিশ করলে আমরা তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে দিয়েছি। এরপর গতাকাল রাতে সে আবার কী যেন ছিনতাই করেছে, সে কারণে এলাকার লোকজন তাকে মারধর করেছে। ওই সময় আমরা মসজিদে মাগরিবের নামাজে ছিলাম। নামাজ শেষে বের হয়ে উত্তেজিত লোকজনকে শান্ত করে সিজানের স্বাজনদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছি। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর সে মারা গেছে। কিন্তু এ ঘটনার সাথে আমাদের সংগঠনের কেউ জড়িত ছিল না।

মারা যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে নেশাগ্রস্ত ছিল। তাই শুরু থেকে কেমন যেন করছিল। তবে আমরা তাকে ভালো হওয়ার অনেক সুযোগ করে দিয়েছি। বিগত সময়ে তাকে অনেকবার বুঝিয়েছি, তার পরিবারের লোকজনদের বুঝিয়েছি। সে মাদক, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। এ ছাড়া তাকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার জন্য ৪০ দিনের চিল্লায় পাঠিয়েছি। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হয়নি।

ভাইরাল হওয়া ভিডিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মারধরের ভিডিও গতকালের। সেখানে সিজান ও তার সহযোগী অনিককে মারধর করা হয়েছে। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শুনেছি অনিক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। আর আমি তাদের মারধর করতে কাউকে উসকানি দেইনি, এটা মিথ্যা কথা।

ফতুল্লা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করতে এখনো আসেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাছাড়া নিহতের বিরুদ্ধে মারামারি মামলা রয়েছে। তবে তাই বলে কেউ তাকে মারধর করে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। আর ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলো যাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্তি পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পরিবারের লোকজন মামলা করেনি। আর নিহত ওই যুবকের বিরুদ্ধে মারামারির মামলা আছে, ছিনতাইয়ের মামলা নেই। তিবে এলাকাবাসী ভাষ্যমতে, ওই যুবক ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। ঘটনার দিন এক ব্যক্তির কাছ থেকে ছিনতাইয়ের অভিযোগ পেয়ে আল ফালাহ নামের সংগঠনের লোকজন তাকে ডেকে নিয়ে মারধর করে। আর সেই সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম কাউসার। আর এই সংগঠনের লোকজন সামাজিক বিভিন্ন কাজে বেশ সোচ্চার। সমাজের বিভিন্ন অপরাধ নির্মূলে তারা কাজ করে আসছে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি ভিডিও দেখেছি। ভিডিওটি যাচাই বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এর আগে, গত ৪ জুলাই রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে সিজান (২৫) নামে এক যুবককে পিটুনি দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ভিডিও ভাইরাল হতে থাকে।