Image description

দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর। প্রধান এই সমুদ্র বন্দরের হৃৎপিন্ড খ্যাত সর্ববৃহৎ কন্টেইনার স্থাপনা নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানির হাতে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তিতে ছেড়ে দেয়ার চলমান প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে মাঠের আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠছে। বন্দর ডক শ্রমিক কর্মচারী এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের (স্টেকহোল্ডার) মাঝে বন্দরের টার্মিনাল অথবা যে কোনো অংশের জায়গা ইজারাদানের উদ্যোগের বিরুদ্ধে বাড়ছে ক্ষোভ-অসন্তোষ। হাসিনা আমলে শেখ পরিবার এবং আওয়ামী অলিগার্ক সিন্ডিকেটের চিহ্নিত চক্রটি সুযোগ বুঝে নেপথ্যে নাড়ছে কলকাঠি। চট্টগ্রাম বন্দরের লাভজনক ও প্রধান স্থাপনা কব্জা করতে একটি তথাকথিত ‘দেশীয়’ কনসোর্টিয়াম বা জোট গঠন করে আড়ালে থেকে সুযোগসন্ধানী আওয়ামী সিন্ডিকেটও তৎপর রয়েছে। তারাও চায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্টাইলে ইজারা চুক্তি হাতিয়ে নিতে। ইতোমধ্যে সেই জোট ইজারা চুক্তির প্রস্তাবও দিয়েছে।

এতে করে বন্দরকে ঘিরে কী হচ্ছে এ নিয়ে সন্দেহ-সংশয় আরো দানা বেঁধে উঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক এবং স্পর্শকাতর অবস্থানে থাকা এনসিটি-সিসিটি চুক্তির মাধ্যমে হাতছাড়া প্রতিরোধে সর্বাত্মক আন্দোলনের হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম এবং বিভিন্ন পেশাজীবি, রাজনৈতিক, শ্রমিক সংগঠন। এই ইস্যুতে চলমান ধারাবাহিক আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন বিএনপির শ্রমিক সংগঠন ও সাবেক বন্দর সিবিএ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

আন্দোলনরত শ্রমিক কর্মচারী সংগঠন ও জোট নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রত্যাখ্যাত, বহুল বিতর্কিত সেই দুবাইভিত্তিক বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারাদানের জন্য পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনার সিদ্ধান্তটি বর্তমানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের আমলে এসে কেন বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে? আন্দোলনকারীরা এরজন্য চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান ও বিডা’র শীর্ষকর্তাকে দায়ী করছেন। একইসঙ্গে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা অতিউৎসাহী হয়ে বন্দরের চালু স্থাপনা অযৌক্তিকভাবে ইজারা চুক্তিতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য এতোটাই তৎপর এবং তোড়জোড় কেন তা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

গতকাল রোববার চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি সিসিটি ইজারা চুক্তির প্রক্রিয়া ইস্যুতে আন্দোলনরত শ্রমিক জোট স্কপের অন্যতম শীর্ষ নেতা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক সাবেক বন্দর সিবিএ সেক্রেটারি কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার দৈনিক ইনকিলাবকে জানান, বন্দর চেয়ারম্যান এবং বিডা’র শীর্ষ ব্যক্তির চরম একগুঁয়েমি মনোভাবের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক এবং গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ স্থাপনা এনসিটি সিসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা চুক্তিতে ছেড়ে দেয়ার জন্য গোপনে তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের স্কপ এবং বন্দর রক্ষা কমিটিসহ ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের মাধ্যমে নিউমুরিং এবং সিসিটি ইজারা চুক্তি প্রক্রিয়া বন্ধে ধারাবাহিক কঠোর থেকে কঠোরতর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। দেশের অর্থনৈতিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপোস করার সুযোগ নেই। আগামীতে এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জনমত জোরালো করা, বিক্ষোভ মিছিল মশাল মিছিল সমাবেশসহ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচত সরকার চট্টগ্রাম বন্দর তথা জাতীয় স্বার্থে এনসিটি সিসিটি ইজারা চুক্তি প্রক্রিয়া থেকে অবিলম্বে সরে আসার ঘোষণা দেবে।

এদিকে আন্দোলনরত শ্রমিক জোট স্কপ নেতারা জানান, শিগগিরই আসছে বৃহত্তর কর্মসূচি। বন্দর রক্ষা কমিটির উদ্যোগে আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে নগরীর স্টেশন রোডে একটি মিলনায়তনে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তি প্রক্রিয়া রোধ ইস্যুতে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে স্কপ এবং বন্দর রক্ষা কমিটির উদ্যোগে গত ৩০ জুন ও ১ জুলাই প্রতিবাদী সমাবেশ, চট্টগ্রাম বন্দর অভিমুখে কালোপতাকা মিছিল, সমাবেশ এবং মানববন্ধন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান, বিক্ষোভ সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের ধারাবাহিক লাভজনক মূল দু’টি কন্টেইনার স্থাপনা বহুল আলোচিত বিতর্কিত দুবাইভিত্তিক বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দীর্ঘ মেয়াদি ইজারা চুক্তিতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের তোড়জোড় অব্যাহত রয়েছে। এরজন্য নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বিডা’ এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষের একে একে পদক্ষেপ চলছে চুপিসারে। ঊর্ধ্বতন সরকারি পর্যায়ের নির্দেশনা অনুসারে ঝটিকা বেগে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী ইজারা চুক্তির প্রক্রিয়া ও শর্ত চূড়ান্ত করতে। এরজন্য গঠিত হয়েছে সাপোর্ট কমিটি।

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি বর্তমানে সুপার স্ট্রাকচার সমৃদ্ধ স্থাপনা। সেখানে কোনো যন্ত্রপাতির ঘাটতি নেই। বরং কিছু কিছু অতিরিক্ত রয়েছে।
এনসিটির কাছাকাছি বন্দরের চ্যানেলে সুনির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য এবং ড্রাফটের জাহাজ আসা-যাওয়া করতে পারে; তাও জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল। সেখানে অত্যধিক বৃহৎ জাহাজের আসা-যাওয়ার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি ও স্থাপনার সঙ্গে লাগোয়া থাকায় এনসিটির সাথে দেশের স্পর্শকাতর নিরাপত্তার নিবিড় সম্পর্ক জড়িত। এনসিটি-সিসিটি ইজারায় দেয়া হলে শুধুই জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) নিয়ে টিকে থাকলে চট্টগ্রাম বন্দরের বস্তার মালামাল ওঠানামা ছাড়া আর কোনো আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে গুরুত্বই থাকবে না। ইতোপূর্বে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ পতেঙ্গা টার্মিনাল, লালদিয়ার চর টার্মিনাল এবং পানগাঁও টার্মিনাল বিদেশি বিভিন্ন অপারেটরের কাছে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কন্টেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সর্ববৃহৎ এবং এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কন্টেইনার শিপিং বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি। বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২০২৫-২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবাহিত মোট কন্টেইনারের ৪৫ শতাংশই এই টার্মিনালের মাধ্যমে হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। তাছাড়া বন্দরের আয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশই জোগান আসে এনসিটি-সিসিটি’র মাধ্যমে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডকের ব্যবস্থাপনায় এনসিটি বিগত ২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং গতিশীলতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বন্দর ব্যবহারকারীরাও সন্তুষ্ট। বন্দর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যদি বিদেশি কিংবা দেশীয় বিনিয়োগ করতে হয় সে ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল প্রকল্প এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগে উন্নয়ন, আধুনিকায়নের অবারিত সুযোগ রয়েছে। অথচ লাভজনক এবং চালু কন্টেইনার টার্মিনাল এনসিটি সিসিটি ইজারা চুক্তিতে ছেড়ে দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক সুনাম লোপ পাবে। বর্তমান কন্টেইনার বন্দর ফিরে যাবে মান্ধাতার আমলে। সুখ্যাতি হারিয়ে ফেলবে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম।