গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে টার্গেট করে উচ্চ বেতনে চাকরির জন্য বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করা যুবকরা ভিটেমাটি, গবাদি পশু আর ঋণ করে বিদেশ যেতে তুলে দেন লাখ লাখ টাকা; এরপর তাদের পাঠানো হয় কম্বোডিয়ায়। কিন্তু স্বপ্নের সেই বিদেশে পৌঁছানোর পর তাদের কাছে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। প্রতিশ্রুত চাকরি তো মেলেই না; বরং শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো যুবকদের দফায় দফায় ‘বিক্রি’ করা হয় চীনের নাগরিকদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কথিত ‘ডেথ ক্যাম্পে’। যেখানে জোরপূর্বক ‘সাইবার ক্রীতদাস’ হিসেবে কাজ করানো হয়। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অমানুষিক নির্যাতনের মধ্যেই জীবনবাজি রেখে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী। তবে এখনো অনেকেই সেখানে আটক আছেন।
গাইবান্ধা জেলা এনসিপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহীদ ও তার বাবা শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিদেশে পাঠিয়ে ‘মানুষ বিক্রির’ এমন শক্তিশালী ভয়ংকর নেটওয়ার্কের তথ্য কালবেলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা এই চক্রের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন দেশে ফিরে এসেছেন এবং আটজন এখনো কম্বোডিয়ায় আটকে আছেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এনসিপি নেতা রাহাদের মাধ্যমে শুধু গাইবান্ধা থেকেই অন্তত ৩০ জন যুবককে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
‘বাপ-ব্যাটার’ এই চক্রের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেকেই। সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হওয়া এবং এখনো কম্বোডিয়ায় আটকে থাকা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেছে কালবেলা। তারা সেখানকার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এবং প্রতারণার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
‘কবির ব্রাদার্স’ চক্রের সঙ্গে মিলেছে রাহাদের নেটওয়ার্ক
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত হুসেইন কবির ও তার ভাই আকাশ এবং বাংলাদেশে থাকা আরেক ভাই হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী মানব পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন গাইবান্ধা জেলা এনসিপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহীদ। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রত্যন্ত এলাকার যুবকদের টার্গেট করে তাদের বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হতো। এই প্রক্রিয়ায় হুমায়ুন কবিরের ‘লাইফস্টাইল স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিসা ও বিদেশ যাত্রার ব্যবস্থা করা হয়।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, এই চক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই প্রস্তুত করতেন। এরপর কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের বিভিন্ন স্ক্যামিং প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ। দেশজুড়েই পুরো নেটওয়ার্কটির এজেন্ট আছে এবং কম্বোডিয়ায় থাকা সদস্যদের সমন্বয়ে গোটা প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
প্রতারণার শুরু হয় যেভাবে
এ প্রতারণার চক্র শুরু হয় স্থানীয় কিছু দালাল বা এজেন্টের মাধ্যমে। তারা প্রথমে গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র, বেকার ও স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের টার্গেট করে থাকে। এরপর ধাপে ধাপে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই এজেন্টরা পরিবারের সদস্যদের বুঝিয়ে বিদেশে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির প্রলোভন দেখায়। যেখানে মাসিক বেতন ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়।
দরিদ্র ও আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলো রাজি হলেই যুবকদের নিয়ে যাওয়া হয় চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযুক্ত গাইবান্ধা জেলা এনসিপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহীদ এবং তার বাবার কাছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এখানেই মূলত বিদেশে পাঠানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এরপর রাহাদের কাছে তাদের ট্রেনিং শুরু হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, গাইবান্ধা শহরের ‘বিন্দু আইটি’ নামে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তাদের প্রশিক্ষণ দেন রাহাদ। তাদের কম্পিউটার টাইপিং, ইংরেজিতে নিজেদের পরিচয় দেওয়া, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল মার্কেটিং শেখানো হয়। ভুক্তভোগী তরুণরা জানান, এনসিপি নেতা রাহাদ তাদের বলেছিলেন ‘ওইখানে গিয়ে তোমরা এসি রুমে থাকবা আর কম্পিউটারের কাজ করবা।’ ট্রেনিং শেষ হলে কম্বোডিয়ায় পাঠানোর জন্য ব্যক্তিভেদে সর্বনিম্ন সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা থেকে সাড়ে সাত লাখ টাকা সরাসরি রাহাদ ও তার বাবার হাতে গুনে দিতে হয়।
নির্যাতন ও ‘সাইবার ক্রীতদাসে’র পরবর্তী ধাপ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের সেখানে থাকা চক্রের স্থানীয় সদস্য হুসেইন কবির ও তার ছোট ভাই আকাশসহ একটি গ্রুপ রাজধানী নমপেনে নিয়ে একটি হোটেলে আটকে রেখে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়।
এরপর শুরু হয় ‘ট্রেনিং’য়ের নামে প্রতারণামূলক কাজ শেখানো। সেখানে ভুক্তভোগীদের শেখানো হতো কীভাবে ছদ্মনামে অনলাইন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রতারণা করা যায়। এর মধ্যে ছিল ভুয়া ক্লোনড ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ক্রেডিট কার্ড থেকে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া নম্বর থেকে ফোন ও চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে ডিপোজিট হাতিয়ে নেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভয়েস ও ভিডিও কল রেকর্ড করে পরে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের কৌশল।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কেউ এসব কাজ করতে না চাইলে বা ব্যর্থ হলে তাদের ওপর চালানো হতো শারীরিক নির্যাতন। অনেক ক্ষেত্রে খাবার বন্ধ করে দেওয়া, মারধর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হতো বলেও তারা জানান। ট্রেনিং শেষে এসব যুবকদের বিভিন্ন চীনা স্ক্যামিং প্রতিষ্ঠানের কাছে দুই থেকে তিন হাজার ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এরপর তাদের বাধ্য করা হতো ‘সাইবার ক্রীতদাস’ হিসেবে প্রতারণামূলক অনলাইন কার্যক্রম চালাতে।
এমনই প্রতারণার শিকার হয়ে পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট এলাকার ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাওন। তিনি জানান, সেখানে একটি টিমে ২০ থেকে ২৫ জন কাজ করতেন। তাকে মেয়ে সেজে ভারতীয় ধনী ব্যক্তিদের টার্গেট করে প্রতারণায় বাধ্য করা হতো।
শাওন বলেন, ‘আমার কাজ ছিল মেয়ে পরিচয়ে কথা বলে ধনী মানুষদের টার্গেট করা। অনেক সময় সফলও হতাম। কিন্তু পরে নিজের কাছে খুব খারাপ লাগত। কাজ করতে না চাইলে নির্যাতন শুরু করত। তারা কারেন্ট শক দিত, খাবার বন্ধ করে দিত।’
আরেক ভুক্তভোগী দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জের এলাকার শাফিন মণ্ডল ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর আমাকে নমপেনে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে একটি হোটেলে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করেন হুসেইন কবির। পরে চায়নিজ একটি চক্রের কাছে আমাকে সাড়ে চার হাজার ডলারে বিক্রি করে দেয়। তারা আমাকে সেখান থেকে নিয়ে গিয়ে পোইপেইট শহরের কাছে জঙ্গলের ভেতরে একটি ভবনে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘তিন মাস নির্যাতনের পর আমি ঠিক করলাম, হয় মরব না হয় বাঁচব কিন্তু এখানে থাকব না। পরে পাসপোর্ট ও ফোন নিয়ে সেখান থেকে বন্দি আরও ২২ জন পালিয়ে আসি। ওরা আমার জীবন শেষ করে ফেলেছে। আমি এর বিচার চাই।’
সাদা মিয়া ও সৈকতদের স্বপ্নভঙ্গ
গাইবান্ধা ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের রসূলপুর গ্রামের ষাটোর্ধ কৃষক ছকু মিয়া। কৃষিকাজ এবং গরু লালন-পালন করে দিন যাচ্ছিল তার। রাহাদের দালাল স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম তার ছেলের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা টাকা বেতন-ভাতা, থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থাসহ একটি বিদেশে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির প্রস্তাব দেয়। ২৭ বছর বয়সী বেকার ছেলে সাদা মিয়ার জন্য এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি ছকু মিয়া।
সাদা মিয়াও ভেবেছিলেন, তার জীবন বদলে যাবে, হাল ধরবেন পরিবারের। প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অভিবাসী কর্মী হিসেবে কম্বোডিয়ায় যান তিনি।
সেখানে পৌঁছানোর পর বুঝতে পারেন বড় প্রতারনার জালে জড়িয়েছেন তিনি। এই চক্রের দালালরা তাকে বিক্রি করে দেন। পরে তিনি কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন।
সাদা মিয়ার বাবা ছকু বলেন, ‘আটটা গরু বিক্রি ও ঋণ করি ছেলের চাকরির জন্য টাকা দিছি। রাহাদ আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, চাকরি না দিয়ে ছেলেকে বিক্রি করে দিয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে। পরে ঋণ করে কোম্পানীকে সেই টাকা শোধ করে ছেলেকে ফিরিয়ে এনেছি। আমরা ক্ষতিপূরণ ও রাহাদের শাস্তি চাই।’
ভুক্তভোগী সাদা মিয়া জানান, কম্বোডিয়ায় গিয়ে তিনি প্রায় দুই মাস ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে তাকে কোনো কাজ দেওয়া হয়নি; বরং একটি কোম্পানির কাছে দুই হাজার ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হয় ।
তিনি বলেন, ‘ওরা আমাকে দুবেলা খাবার দিত, একবেলা দিত না। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করতে দিত না। একপর্যায়ে আমার সঙ্গে থাকা ইয়াসিনের মাধ্যমে বাবার কাছ থেকে টাকা এনে সেই কোম্পানিকে দুই হাজার ডলার পরিশোধ করে দেশে ফিরে আসি।’
সাদা মিয়া আরও অভিযোগ করেন, ‘দেশে ফিরে রাহাদের কাছে টাকা চাইতে গেলে তার বাবা লাঠি নিয়ে আমার বাবাকে মারতে আসে। আমি দালাল রাহাদ ও সেলিমের বিচার চাই। যে টাকা খরচ হয়েছে, তা ফেরত চাই।’
একই এলাকার কঞ্চিপাড়া বাজারের নরসুন্দর হৃদয় চন্দ্র সেনের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল অভিযুক্ত এনসিপি নেতা রাহাদের। হৃদয় চন্দ্রের অভিযোগ, তার ভাতিজা সৈকতকে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ নিয়ে যায়। সৈকতের বাবা গণেশ চন্দ্র সেনের কাছ থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা নেয় রাহাদ। সৈকতকেও কম্বোডিয়ায় পাঠানোর পর সেখানে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রতারণার শিকার হয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
হৃদয় চন্দ্র সেন বলেন, ‘ওরা বাবা ছেলে দুইজনই এর সঙ্গে জড়িত। এই এনসিপি নেতা সুযোগসন্ধানী, সবসময় সে খোলস পাল্টায়। আওয়ামী লীগের সময় আওয়ামী লীগ, ভোটের আগে সে এনসিপিতে যোগ দেয়। এলাকায় টিসিবি ডিলার হিসেবে রাহাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তার প্রতারণায় আমার ভাতিজার জীবনটি শেষ করে ফেলছিলাম, আমরা তার শাস্তি ও টাকা ফেরত চাই।’
শুধু সাদা মিয়া ও সৈকত নয় রাহাদ ইবনে শহীদের প্রতারণার শিকার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের হযরত আলির ছেলে ইয়াসিন আলি, একই এলাকার রেজাউলের ছেলে সাগর, কিশোর শাওন আহমেদ, কাজল হোমেন, নাইম মিয়া, উপজেলার গুপ্তমনির চরের সাহাদাৎ হোসেনের ছেলে আবু হানিফ, সদর উপজেলার বাদিয়াখালি এলাকার রাশেদ, বালাসীঘাট এলাকার রাফি, শাওন, ইউসূফ ও তার ভাই, সদর উপজেলার বল্লমঝাড় এলাকার রাহান, পৌরশুভ্রা শাপলা মিল এলাকার নিলয় মারুফ, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ভাদুরিয়া এলাকার শাফিন মন্ডল তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এদের বাইরে আরও অনেক ব্যক্তিকে রাহাদ ও তারা বাবা শহিদুল ইসলামের প্রতারণার ফাদে ফেলেছেন বলে জানিয়েছেন।
জঙ্গলে পালিয়ে আছি, দেশে ফিরতে চাই
গত রোববার (বাংলাদেশ সময়) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে কালবেলা প্রতিবেদকের কথা হয় কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া এলাকার সাগর এবং সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা এলাকার হাসান আলীর সঙ্গে। তাদের সঙ্গে একই এলাকার কাজলও সেখানে আটকে আছেন তারা জানান।
সাগর জানান, তখন কম্বোডিয়ার স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টা। তিনি, হাসান ও কাজল তাদের কর্মস্থল থেকে পালিয়ে তিন দিন আগে থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী পোইপেট শহরের কাছাকাছি একটি জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন; খাবার ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একই এলাকার রাহান, নিলয় ও মারুফ তাদের পাশের কোন এক এলাকায় আছেন বলে জানান।
সাগর বলেন, ‘রাহাদের বাবাকে আমি নিজে সাড়ে ৫ লাখ টাকা গুনে দিয়ে এখানে এসেছি। ওরা বাপ-ব্যাটা প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত। এখানে আসার পর আমাদের নির্যাতন করেছে। আমাদের চীনা কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের অভিযানের সুযোগে আমরা কোম্পানি থেকে পালিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছি। এখনো ঠিকমতো খেতে পারছি না। অনেককে ফোন দিচ্ছি, কেউ ধরছে না। আমরা দেশে ফিরতে চাই।’
আরেক ভুক্তভোগী হাসান আলী বলেন, ‘প্রথমে রাহাদের কাছে ট্রেনিংয়ের জন্য ১২ হাজার টাকা দেই, পরে আসার আগে আবার সাড়ে ৫ লাখ টাকা দেই। বাবার জমি বিক্রি করে এখানে এসেছি। কিন্তু এখানে কাজ তো দূরের কথা, উল্টো জীবন বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
দফায় দফায় বিক্রি, কমিশন পায় রাহাদ
কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর চীনা স্ক্যামিং কোম্পানিগুলোতে অভিবাসীদের দফায় দফায় বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাদের ‘কবির সিন্ডিকেট’ বিক্রি করে দেয়। তাদের ভাষ্যমতে, চীনা কোম্পানিগুলো প্রথমে ইন্টারভিউ নিয়ে ভুক্তভোগীদের ‘মূল্য’ নির্ধারণ করত। এরপর সর্বনিম্ন বারোশ ডলার থেকে শুরু করে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামে তাদের বিক্রি করা হয়, যা পরিচালনা করতেন সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে পরিচিত হুসেইন কবির।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, কেউ যদি নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করে দেশে ফিরতে চাইত, তাহলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হতো, এমনকি হত্যার হুমকি দিয়ে আবার অন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এভাবে হাত বদলের অর্থ থেকে একটি অংশ কমিশন হিসেবে দেশে থাকা চক্রের সদস্যরা পেতেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তাদের অভিযোগ, এই কমিশনের অংশ পেতেন চক্রের সঙ্গে যুক্ত রাহাদ ইবনে শহীদও।
কম্বোডিয়ার জঙ্গলে আটকে পড়া ভুক্তভোগী সাগর জানান, তাকে দফায় দফায় বিক্রি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কবির আমাকে মোট দুবার বিক্রি করেছে। প্রথমবার ২ হাজার ডলার, আরেকবার ১২শ ডলারে। এই টাকার কমিশন দেশে থাকা রাহাদ ও কবিরের এজেন্টরা পায়।’
দেশে ফিরে আসা আরেক ভুক্তভোগী ইয়াসিন আলী জানান, হুসেইন কবির তাকে তিন দফায় তিনটি ভিন্ন কোম্পানিতে বিক্রি করেছে। তিনি বলেন, ‘যতবার বিক্রি করতে পারবে, ততই লাভ। এ টাকার কমিশন অন্যরাও পায়।’
কম্বোডিয়ায় আটক সাগরের অভিযোগ, প্রথমবার বিক্রির পর তিনি ওই কোম্পানির টাকা পরিশোধ করেন। পরে তিনি দেশে ফিরতে চাইলে হুসেইন কবির তাকে ডেকে নেন। পরে আবারও তাকে নির্যাতন করে অন্য একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়।
তিনি আরও জানান, তাদের সঙ্গে থাকা এক যুবক সাত মাস সেখানে কাজ করার পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে ওই যুবক কম্বোডিয়াতেই মারা যান। পরিবার তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইলে অভিযুক্ত হুসেইন কবির ২৭ লাখ টাকা দাবি করেন বলে জানান তিনি।
এদিকে ভুক্তভোগী ইয়াসিন আলী জানান, দেশে ফিরে তিনি রাহাদের বাড়িতে টাকা ফেরত চাইলে তার বাবা লাঠি নিয়ে মারতে তেড়ে আসেন। পরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ অভিযোগ না নিয়ে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে।
তবে ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্র কর্মকর্তা (ওসি) নূরুল হুদা কালবেলাকে বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই। আমি কোর্টে সাক্ষী দিতে এসেছি, এটা বলতে পারব না।’
গত ২ মার্চ দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ভাদুরিয়া এলাকার ভুক্তভোগী শাফিন মণ্ডলের বাবা নূর ইসলাম বাদী হয়ে দিনাজপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মানব পাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় গাইবান্ধা জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহিদ ও তার বাবা শহিদুল ইসলামসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পিবিআই দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত উপ মহাপরিদর্শক) মাহফুজ্জামান আশরাফ কালবেলাকে বলেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাসপোর্ট ও ভিসা সঠিক আছে। কিন্ত সে এজেন্সির মাধ্যমে কোথায় গেছে আমরা তা পাইনি।
তিনি আরও জানান, নতুন করে যে অভিযোগগুলো এসেছে, সেগুলোর প্রমাণ পাওয়া গেলে তা তদন্তে এবং প্রয়োজন হলে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট সহায়ক হবে।
মানব পাচার ও বিক্রি সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেলা এনসিপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব রাহাদ ইবনে শহীদ কালবেলাকে বলেন, ‘মানব পাচারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমি আমার বাবার সঙ্গে ব্যবসা করি। আমাকে এগুলোতে জড়ানো হচ্ছে এবং কারা করছে, তা আমি জানি।’
তবে তার ও তার বাবার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কালবেলার প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলার রুচি নেই। আপনি ভালো থাকেন ভাই।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অভিযোগের বিষয়ে রাহাদ ইবনে শহীদের বাবা শহিদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, আমি ও আমার ছেলে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নই। আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করি। এসব মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। আমাদের আসামি করে যে ব্যক্তি মামলা করেছে, তার সঙ্গে আমাদের চালের ব্যবসা নিয়ে লেনদেন ছিল।
তবে ভুক্তভোগীর বাবা ও মামলার বাদী নূর আলম বলেন, তিনি ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোহিনুর কেমিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি ফিড কোম্পানির দিনাজপুর এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত এবং স্থানীয় বাজারে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসা করছেন।
তার দাবি, তিনি বা তার পরিবারের কেউই চালের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। অভিযোগ থেকে বাঁচতেই অভিযুক্তরা এ ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবি তুলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে কম্বোডিয়ায় মানব পাচার নেটওয়ার্কের অন্যতম হোতা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে কথা বলতে তার ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল ও মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি ফিরতি কল কিংবা মেসেজের উত্তর দেননি।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম-মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) ও কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা কালবেলাকে বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানলাম। এ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি উপস্থাপন করব।’