Image description
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালি এখন বন্ধ। এতে করে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি তেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় তেল সংগ্রহে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্য দেশ বা উৎস থেকে তেল আমদানির অংশ হিসাবে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা যায়।

এদিকে, প্রায় আড়াই লাখ টন জ্বালানি তেল বোঝাই ৭টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করছে। আরও একটি জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমার কাছাকাছি রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো জাহাজ তেল খালাসের জন্য ৬ দিন ধরে বহির্নোঙরে অপেক্ষায় আছে। একসঙ্গে এত জাহাজ আসায় আগামী এক মাস অন্তত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ। সংশ্লিষ্টরা জানান, যুদ্ধবিরতির সুযোগে একসঙ্গে ৮টি তেলের জাহাজ পাওয়া দেশের জন্য ভালো খবর। এর ফলে মে মাস ও জুনের কয়েক দিন দেশে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে। এছাড়া জুনের বাকি সময় এবং জুলাইয়ের তেল সংগ্রহ নিয়েও চেষ্টায় আছে জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

গত এক সপ্তাহ ধরে অকটেন, পেট্রোল এবং ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর কারণে সারা দেশে তেলের সংকট কিছুটা হলেও কমেছে। চাহিদার ৮০ শতাংশ পেট্রোল এবং অকটেন দেশে উৎপাদন হয়। ফলে এ দুটি জ্বালানি পণ্য নিয়ে সরকারের চিন্তা কম। কিন্তু মূল উদ্বেগ ডিজেল নিয়ে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সেই ডিজেল ৯০ দিনের বেশি মজুতের নির্দেশনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও বিপিসির সূত্রগুলো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরপর তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিএসপি, ইউনিপ্যাক এবং ভিটল বেশ কয়েকটি তেলের পার্সেল (জাহাজ) বাতিল বা সরবরাহের সূচি পরিবর্তন করে। ওই তিনটি কোম্পানি পার্সেলগুলো সরবরাহ দিচ্ছে। এ কারণে এখন একসঙ্গে তেলবাহী ৮টি জাহাজ এসেছে। যার মধ্যে ৭টি চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে এবং একটি বুধবার নোঙর করবে।

ভিটলের জাহাজ এমটি কুইটা ২৩ এপ্রিল ৩৩ হাজার ৪০০ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ে। এটিকে বার্থিং করা হয় ২৫ এপ্রিল। এখন তা থেকে লাইটারেজের মাধ্যমে তেল খালাস করা হচ্ছে। ভিটলের আরও একটি জাহাজ এমটি প্রিভি এনজেল ৩৫ হাজার ৫৫ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে ২৪ এপ্রিল বহির্নোঙরে আসে। এটি থেকেও লাইটারেজের মাধ্যমে তেল খালাস করা হচ্ছে। জাহাজটি আজ (সোমবার) বার্থিং করা হবে। ভিটলের আরও একটি পার্সেল এমটি লিয়ান সন-হু ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেল নিয়ে ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। এর সব তেল এমটি গ্রেড প্রিন্সেস নামে অন্য একটি জাহাজে লোড করে রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে বার্থিং করা হয়। এখন সেই জাহাজ থেকে তেল খালাস করা হচ্ছে। বিপিসিতে তেল সরবরাহকারী ইন্দোনেশিয়ান প্রতিষ্ঠান বিএসপির জাহাজ এমটি এফপিএমসি ৩৪ হাজার ৩৫৩ টন ডিজেল নিয়ে ২০ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর করে। এ জাহাজ থেকে কবে নাগাদ তেল খালাস করা হবে তার সময় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। বিএসপির আরও একটি জাহাজ এমটি হাফনিয়া চিটাম ৩৩ হাজার ৪০৫ টন ডিজেল নিয়ে ২১ এপ্রিল বহির্নোঙরে আসে। তবে এ জাহাজ থেকেও তেল খালাসের সময়সূচি এখনো নির্ধারণ করেনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিএসপির ৯ হাজার ৯৭৪ টন ডিজেল নিয়ে আরও একটি জাহাজ এমটি হাফনিয়া মারলিন চট্টগ্রাম বন্দরে বহির্নোঙরে আসবে ২৮ এপ্রিল (মঙ্গলবার)। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভিটলের ২৬ হাজার ৫১৮ টনের অকটেনবাহী জাহাজ বহির্নোঙরে ভিড়বে ২৯ এপ্রিল। ভিটলের ৩৪ হাজার ৬৬৭ টনের জেট ফুয়েল নিয়ে এমটি জিং টং নামে অপর একটি জাহাজ গত ২৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। শনিবার এটি বার্থিং করা হয়। তবে এটি থেকে তেল খালাস এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। যদিও জাহাজগুলো থেকে দ্রুত তেল খালাসের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে বিপিসি। সংশ্লিষ্টরা জানান, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একসঙ্গে দুটির বেশি জাহাজ থেকে তেল খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ৮টি জাহাজের মধ্যে ভিটলের এমটি লিয়ন সান জাহাজ ৬ এপ্রিল, বিএসপির এমটি এফপিএমসি জাহাজ ৩১ মার্চ এবং বিএসপির এমটি হাফনিয়া চিতা ১০ এপ্রিল চট্টগ্রামে আসার কথা ছিল। জাহাজগুলো দেরিতে আসায় তেল খালাসের বিলম্বের জন্য সরকারকে কোনো জরিমানা দিতে হবে না।

এদিকে, এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) নিয়ে বাংলাদেশ আসছে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামে একটি জাহাজ। এটি গত ৬ দিন আগে (২১ এপ্রিল) সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। সবকিছু ঠিক থাকলে ৬ মে জাহাজটি বাংলাদেশে পৌঁছবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে নিরাপত্তাজনিত কারণে জাহাজটি ইন্টিগ্রেটেড অটোমেশন সিস্টেম (আইএএস) বন্ধ রেখেছে। বাংলাদেশ জি-টু-জি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি করে। আমদানিকৃত এসব তেল পরিবহণ করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)।

গত বছর ৬০০ কোটি ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশকে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়েছিল। এবার যুদ্ধের কারণে এ খরচ আরও অনেক বাড়তে পারে। এর চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধাকালীন সময়ে সহজে তেল পাওয়া যায় না। মার্চে বাংলাদেশকে এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এমন বাস্তবতায় নিয়মিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়াও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির (ওটিএম) মাধ্যমে তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি মাথায় রেখে সব উৎস থেকে তেল কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাই নিয়মিত দরপত্রের বাইরে ওটিএমে তেল কেনা হবে। এজন্য খুব শিগগির দরপত্র আহ্বান করা হবে।

জানা গেছে, ওটিএমে তেল কিনতে তেল সরবরাহের অভিজ্ঞতা, ব্যবসার লেনদেন এবং অন্যন্য শর্ত সহজ করা হচ্ছে। যাতে করে যে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারে।

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সরসরি ক্রয় নীতি (ডিপিএম) বা সরকার টু সরকার (জি-টু-জি) এর মাধ্যমে তেল কিনতে নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, আলজেরিয়া, ব্রুনাই, অস্ট্রেলিয়া, কাজাগিস্তান, আজারবাইজান, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াসহ ১০টি দেশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে গত এক মাসেও কোনো দেশ তেল দেওয়ার ব্যাপারে সাড়া দেয়নি। ফলে সরকারকে নানামুখী বিকল্প চিন্তা রাখতে হচ্ছে।