Image description

ফের উত্তপ্ত সন্ত্রাসের জনপদ হিসাবে পরিচিত রাউজান। ২ মাস বিরতির পর এখানে শুক্রবার গভীর রাতে আবারও এক বিএনপিকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গুলিতে নিহত যুবকের নাম কাউসার জামান বাবলু। এ নিয়ে গত ২১ মাসে ২২টি খুনের ঘটনা ঘটল। যার বেশির ভাগই রাজনৈতিক হত্যা। সর্বশেষ নিহত জামান বাবলুর কোনো পদপদবি না থাকলেও তিনি এলাকায় বিএনপিকর্মী হিসাবে পরিচিত। প্রতিপক্ষ যারা এ হত্যার সঙ্গে জড়িত তারাও বিএনপির কতিপয় নেতার ছাত্রছায়ায় রয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

এদিকে বাবলু খুনের ঘটনায় তার বাবা আবুল কালাম বাদী হয়ে রাউজান থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পুলিশ মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে। তারা হচ্ছে-মো. শফি ও মো. সুমন। শনিবার রাতে পূর্ব রাউজান এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

ঘটনার দিন নানাবাড়িতে দাওয়াত সেরে মামাতো ভাই আশরাফুর রহমানসহ হেঁটেই বাড়ি ফিরছিলেন বাবলু। কিছু দূরে আসতেই বন্দুকধারী ১১-১২ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাদের ঘিরে ফিলে। এ সময় তারা দুজনই পালানোর চেষ্টা করেন। তারা ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখন পেছন থেকে বাবলুকে লক্ষ্য করে গুলি করে একজন। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। গুলির শব্দ ও মামাতো ভাই আশরাফুর রহমানের চিৎকার শুনে এলাকার লোকজন বেরিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে স্বজনরা বাবলুকে হাসপাতালে নিলেও বাঁচাতে পারেননি।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) রাসেল বলেন, প্রত্যক্ষ সাক্ষী, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শনিবার রাতে পূর্ব রাউজান এলাকা থেকে মোহাম্মদ কাউছার জামান বাবলু হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি মো. শফি ও পাঁচ নম্বর আসামি মো. সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাবলুর বাবা আবুল কালাম বলেন, বাবলুর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। তবে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী বাবলুকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল। একাধিকবার তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।

রাউজানে যত খুন : গত ২১ মাসে রাউজানে ২২টি হত্যা সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টিই রাজনৈতিক হত্যা। এর মধ্যদিয়ে রাউজান উপজেলা সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে প্রথম খুনের ঘটনা ঘটে ২৮ আগস্ট। ওই দিন বিকালে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে। তিনি বেতবুনিয়া সুগারমিল ডাকবাংলো এলাকার কবির আহাম্মদের ছেলে। ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সাবেক সংসদ-সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে মো. ইউসুফ মিয়া নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ইউসুফ রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল শুক্কুর মিয়ার বাড়ির মৃত শামসু মিয়ার ছেলে। তাকে রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। গত বছরের ১১ নভেম্বর নিখোঁজের ৩ দিনের মাথায় রক্তাক্ত অবস্থায় হাফেজ মাওলানা আবু তাহের নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি রাউজানের চিকদাইর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আকবর শাহ (রহ.) বাড়ির মৃত আবদুল মান্নানের ছেলে। ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকায় গ্রামের বাড়িতে জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন নগরীর খাতুনগঞ্জের আড়তদার মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি শহর থেকে মোটরসাইকেলে বাড়িতে গিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর আলম নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নিরামিশপাড়ার মৃত আবু ছৈয়দ মেম্বারের ছেলে। একই ভাবে গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ হাসান নামে এক যুবলীগকর্মীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা। হাসান নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আহমেদ হোসেন মেম্বারের বাড়ির মো. বজল আহমেদ ড্রাইভারের ছেলে। একই বছরের ১৫ মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের মারধর ও ছুরিকাঘাতে খুন হন কমর উদ্দিন জিতু নামে এক যুবদলকর্মী। জিতু হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর সর্ত্তা গ্রামের মুহাম্মদ আলীর ছেলে। ওই বছরের ২১ মার্চ পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হোয়ারাপাড়া এলাকার মোবারক খালের পূর্ব পাশে খোলা জমি থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় মো. রুবেল নামে এক তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়। রুবেল নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার মৃত নুরুল আলমের ছেলে। ১৯ এপ্রিল রাতে খুন হন যুবদলকর্মী মানিক আবদুল্লাহ। ১৫ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী এসে ভাত খাওয়া অবস্থায় তার মুখে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। গত বছরের ২২ এপ্রিল রাউজান উপজেলা সদরের কাছে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গাজিপাড়া গ্রামে খুন হন ইব্রাহিম নামের এক যুবদল কর্মী।

গত বছরের ৭ অক্টোবর প্রকাশ্যে হাটহাজারীর ব্যস্ত সড়কে গাড়ি থামিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় আবদুল হাকিম নামের এক ব্যবসায়ীকে। তিনি ছিলেন রাউজানের বাসিন্দা ও গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসাবে পরিচিত।

রাউজানে বিভিন্ন হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত এক ডজনের বেশি মামলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আসামি গ্রেফতার হয়নি।