Image description

জোবাইদা নাসরীন

গত ২ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, অনেকে ভাইস চ্যান্সেলর হতে তদবির করছেন; এটা দুঃখজনক। আবার গত ১৭ মার্চ, এক দিনে বিএনপি সরকার সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে, যাদের মধ্যে একজন সরাসরি বিএনপির পদধারী নেতা। বাকি ছয়জনও বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতা (প্রথম আলো, ১৭ মার্চ ২০২৬); তাদের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। উপাচার্য নিয়োগ সম্পর্কে কোনটা বিএনপির প্রকৃত অবস্থান?

অন্তর্বর্তী সরকারও বলা যায়, তদবিরের জোরেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মতাদর্শের শিক্ষকদের এবং কোথাও কোথাও পরিচিত, স্বজনদের বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর দায়িত্ব দিয়েছিল। আস্তে আস্তে বের হচ্ছে সেই উপাচার্যদের আমলনামা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সময়ে উপাচার্য ছিলেন সালেহ্‌ হাসান নকীব। কথা শুনে মনে হবে, বেশ শক্ত নীতির মানুষ। ফেসবুকে তাঁর নামে এক ফটোকার্ড ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ব্যর্থতা নিয়ে বেশ আহাজারি আছে। এ জন্য কারা দায়ী তা উল্লেখ করে বেশ রাগ ঝেড়েছেন সংশ্লিষ্টদের ওপর। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের খবর, ক্যালেন্ডারের হিসাবে ৫৫৭ দিন উপাচার্য থাকাকালে তিনি উল্টো পথেই চলেছেন। এ সময়ে তিনি ১৫টি সিন্ডিকেট বৈঠকের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিয়েছেন ৪৭৮ জনকে। রীতিমতো রেকর্ড গড়েছেন তিনি। নিকট অতীতে এত অল্প সময় দায়িত্বে থেকে কোনো উপাচার্য এত বেশি জনবল নিয়োগ দিতে পারেননি।  নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৫৪ জন শিক্ষক, ছয় চিকিৎসক, তিন কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন ৩১৫ জন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি যাদের নিয়োগ দিয়েছেন, অধিকাংশই জামায়াতপন্থি। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের এক ‘পৃষ্ঠপোষক’কে জুলাই কোটায় বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি (সমকাল, ৩ মে ২০২৬)। 

মনে আছে নিশ্চয়ই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নিয়োগকাণ্ডে সবচেয়ে আলোচিত উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান। উপাচার্য হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদে (চার বছর) ৫৯৫ শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ দিয়েছিলেন ২৪৩ জনকে। সালেহ্‌ হাসান নকীব তাঁকেও ছাড়িয়ে গেছেন। 

পিছিয়ে ছিলেন না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইয়াহ্‌ইয়া আখতার। তিনিও অল্প সময়ে ৪২৫ জন নিয়োগ দিয়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের নিয়োগ নিয়েও বিভিন্ন সময় আলোচনা ছিল। কিন্তু যে আমল নিয়ে কথা উঠলেই স্বজনতোষণ আর তথাকথিত অলিগার্কির প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনার ঝড় ওঠে, সে আমলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এত অল্প সময়ে এত বেশি নিয়োগ হয়নি। লক্ষণীয়, ওই উপাচার্যদের নিয়োগ হয়েছিল দুজন শিক্ষা উপদেষ্টার হাত দিয়ে, যারা নিজেরাই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। 

প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন ওই উপাচার্যরা লাগামহীন ক্ষমতাচর্চা করেছেন? কিংবা এই ক্ষমতার উৎস কী? এর উত্তর খুঁজতে আমাদের খুব বেশি ঘাম ঝরাতে হবে না। সেটা হলো, ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার সহযোগী দলের সমর্থনই তাদের এত বেপরোয়া করে তোলে। অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যত দলনিরপেক্ষ হলেও এখন সবাই জানেন, তার মূল শক্তি ছিল জামায়াত ও এনসিপি। বিএনপিকেও সন্তুষ্ট রাখতে হয়েছে সে সরকারকে। এ দলগুলো যে যেভাবে পেরেছে সরকারি প্রশাসনের মতো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও দখল করেছে; সরকার তাতে সিলমোহর দিয়েছে শুধু। তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নিজেই তা এক আলোচনা সভায় বলেছেন সবিস্তারে। এই দলীয় সমর্থক কিংবা কর্মী হওয়ার কারণেই উপাচার্যরা গড়ে তুলেছিলেন পাওয়ার হাউস; চালিয়েছিলেন চরম স্বেচ্ছাচারিতা। 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপাচার্য নিয়োগ সংক্রান্ত তদবির দেখে দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু কেন শিক্ষকরা তদবিরে নামেন? বিগত দশকগুলোতে ক্ষমতাসীন দলগুলোই কি অপসংস্কৃতিকে উৎসাহিত করেনি, যেখানে বিএনপির দায় একেবারে কম নয়? 

বাংলাদেশে নব্বই দশক থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ হয়। চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটের প্যানেলের মাধ্যমে উপাচার্য নির্বাচনের কথা থাকলেও গত কয়েক দশকে দেখা গেছে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্য পরিবর্তন হয় এবং প্রথমে সাময়িক দায়িত্ব পেয়ে পরে উপাচার্যরা সিনেটে সেটি পাস করিয়ে নেন। যখন ক্ষমতাসীন দলভক্ত শিক্ষকদের মধ্য থেকে সরকার উপাচার্য নিয়োগ দেয়, তাতে সেই উপাচার্য নিজেকে সহজেই সরকারের আস্থাভাজন মনে করেন। তখন তিনি রাজনৈতিকভাবেও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। তাই সেই উপাচার্যের পক্ষে ধরাকে সরা জ্ঞান করা কোনো বিষয় নয়। 

দলীয় লোক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভরে ফেলার ভাবনা আসে একই উৎস থেকে। যত বেশি তারা নিজেদের লোক নিয়োগ দেবেন তত বেশি তারা আধিপত্য ধরে রাখতে পারবেন; তাদের গুণগ্রাহী বাড়বে; আরও দ্রুত বাড়তে থাকবে তোষামোদকারী। গদি ঠিক রাখার জন্য সরকারের খেদমতকারীতে পরিণত হবেন তারা, এটাও তাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে যখন অন্য শিক্ষকরা দেখেন একজন উপাচার্যের কত ক্ষমতা, তখন তারাও উপাচার্য হতে চান তদবির, তোষামোদ, জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কত খারাপ সেগুলোর প্রমাণ জোগাড় করে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয় তিনি কত বেশি দলকানা– সেটি প্রমাণের চেষ্টা। 

বর্তমান সরকার শিক্ষাঙ্গনকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এই যে সাবেক উপাচার্যদের দুর্নীতির ফিরিস্তি বের হচ্ছে, তাদের কাউকে কি জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে? হয়নি, যেমন হয়নি এর আগের আওয়ামী লীগ আমলের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত ও বিচার। হবে কীভাবে! নিজেরাও তো একই পথের পথিক।  

এই যে এক বিষাক্ত বৃত্তের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঢুকে পড়েছে, তারই ফল কিন্তু উচ্চশিক্ষার মানের ক্রম অধঃপতন। একে ভাঙাই হবে প্রধান কাজ। সরকার যদি তা করত তাহলে তদবির আর হতো না; মির্জা ফখরুলকেও দুঃখ পেতে হতো না।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়