ক্রমেই জটিল হচ্ছে বরিশাল আদালতের পরিস্থিতি। বিচারকের এজলাসে হট্টগোল ও অসদাচরণের ঘটনায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী পরিষদের নেতা সাদিকুর রহমান লিংকনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
জননিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে ১২জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে। এরা সবাই জাতীয়তাবাদী আইনজীবী পরিষদের সদস্য ও বিএনপি নেতা। এবার এই ১২ আইনজীবীর আইন পেশার সনদ বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গতকাল বরিশালে আদালতের এজলাসে ভাঙচুর ও বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনায় তাৎক্ষণিক তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে বরিশালের যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আবদুল্লাহ আল ইউসুফ ও অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. মিল্টন হোসেন।
তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে মর্মে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বরিশাল মহানগর দায়রা জজের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এছাড়া ওই ঘটনায় বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির জড়িত ১২ সদস্যের সনদ বাতিল করতে বার কাউন্সিলের সচিব বরাবর সুপারিশ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর আবেদন করা হয়েছে। অপরদিকে বরিশালের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে ভাঙচুর এবং বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনায় নয়জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বুধবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এই রুল জারি করেন। আদালত অবমাননার ঘটনায় নয় আইনজীবীর বিরুদ্ধে কেন যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। একইসঙ্গে তাদের আগামী ১০ দিনের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শফিকুর রহমান।
রুল জারি হওয়া বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির নয় সদস্য হলেন- সাদিকুর রহমান লিংকন, মীর্জা রিয়াজুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ, নাজিমুদ্দিন পান্না, মহসিন মন্টু, মিজানুর রহমান, আব্দুল মালেক, সাঈদ ও হাফিজ উদ্দিন বাবলু। এর আগে বরিশালের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে ভাঙচুর এবং বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনায় জেলা আইনজীবী সমিতির ১২ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাস ভাঙচুর, সরকারি নথি ও মালামাল বিনষ্ট করা, বিচারককে ভয়ভীতি প্রদর্শন, শক্তির মহড়া ও দাপট প্রদর্শন, ত্রাস সৃষ্টি, অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বিচার প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বিচার কাজে বাধা এবং এজলাস থেকে নেমে যেতে বাধ্য করা, সরকারি কর্মচারীদের মারধর করার অভিযোগ আনা হয়। পরে সাদিকুর রহমান লিংকনকে বুধবার গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে পুলিশ।
অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজীব মজুমদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করেছেন, একটি মামলার জামিনকে কেন্দ্র করে ২৪শে ফেব্রুয়ারি সকালে আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনসহ ১৫/২০ জন আইনজীবী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বর্জন ঘোষণা করে বিচারকদের উদ্দেশ্যে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। তারা বিচারকদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন আপত্তিকর স্লোগান দিতে থাকেন। এতে আদালত প্রাঙ্গণে ভীতিকর পরিবেশ এবং জনমনে ত্রাসের সৃষ্টি হয়। এরপর দুপুরে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে প্রবেশ করে আইনজীবীকে শুনানি করতে নিষেধ করেন। তবে আইনজীবী বিপ্লব শুনানি চালিয়ে যেতে থাকলে উপস্থিত আইনজীবীদের বারের সভাপতি এজলাস থেকে বের হয়ে যেতে বলেন।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বারের সভাপতি একজন আইনজীবীকে এজলাসেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে থাকা আইনজীবীরা জিআরও শম্ভু এবং কোর্ট ইন্সপেক্টর তারক বিশ্বাসকে ধাক্কা দিয়ে এজলাস থেকে বের করে দেন। ডায়াসে থাকা মাইক্রোফোন ভাঙচুর করেন। এজলাসে থাকা কজলিস্ট, মামলা দায়ের রেজিস্ট্রার ছিঁড়ে নষ্ট করে আদালত এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করেন। বারের সভাপতি এজলাসে থাকা টেবিল ভেঙে ফেলেন, বসার টুল উপড়ে ফেলেন এবং ধমকে উপস্থিত আইনজীবী ও বিচার প্রার্থীদের কোর্ট থেকে বের করে দেন। এমনকি বিচারককে জোরপূর্বক এজলাস থেকে নেমে যেতে বাধ্য করেন।