নতুন সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন। সাধারণত নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে ‘হানিমুন কাল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী এই সময়কাল ১৮০ দিন পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। এই সময়ে সরকার কতটা কার্যকরভাবে সেবা দিতে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ভিত্তিতেই প্রাথমিক মূল্যায়ন হবে। নির্বাচনে জনগণের বড় অংশের সমর্থন পাওয়ায় সরকারের ওপর মানুষের প্রত্যাশা উচ্চ এবং একই সঙ্গে চাপও প্রবল।
প্রধানমন্ত্রী নিজে অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করছেন, ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে গাড়ি চালাচ্ছেন এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে ত্বরান্বিত। তার কর্মগতি মাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মন্ত্রী ও আমলাদেরও কাজ করতে হবে। সরকারের কর্মদক্ষতা মূলত এই দলের সক্রিয়তার ওপর নির্ভর করবে।
বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, মব সন্ত্রাস আর চলবে না। এ ছাড়া চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জিরো টলারেন্স নীতি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো চাঁদাবাজ যেন ক্ষমতাসীন দলের প্রশ্রয় না পায়, তা নজরদারি করতে হবে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে চাঁদাবাজির ঘটনা প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীর মোহাম্মদপুরসহ কিছু এলাকায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজির খবর পাওয়া গেছে।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, তার সরকার ‘গণতান্ত্রিক অর্থনীতি’ চালু করবেন। অর্থনীতি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে না এবং ব্যবসা-বাণিজ্য উন্মুক্ত ও সুষম ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। সিন্ডিকেট বা চক্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ দেবে না। তবে রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় অর্থনীতিতে দুর্বৃত্তায়নকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
দুর্নীতি দমন সরকারী কর্মকাণ্ডে প্রধান চ্যালেঞ্জ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের দুর্নীতির রেকর্ড খারাপ। এর প্রভাব দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রোধ করা অপরিহার্য।
মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা সরকারের অন্য একটি বড় দায়িত্ব। যানজট নিয়ন্ত্রণ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, রেল ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে রাজধানীর যানজট কমানো হবে। মেট্রোরেল সুবিধা চালুর মাধ্যমে নাগরিক জীবনযাত্রা অনেকাংশে সহজ হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবাও সরকারের অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় মানসম্মত, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি শিক্ষা কমিশন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতে কম খরচে সেবা এবং বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত না হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ বড় হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়বে। তবে গ্রামে চিকিৎসক পাঠানোয় শিক্ষার পরিবেশ ও সন্তানদের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা বড় বাধা।
প্রধানমন্ত্রী বলছেন, দেশের স্থিতিশীলতা এবং যুগোপযোগী আমলাতন্ত্র গড়ে তুলতে হলে যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব হ্রাস, এবং সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংসদে ২০ মার্চ প্রথম অধিবেশন বসবে। স্পিকার নির্বাচন, রুটিন কার্যাদি ও প্রাণবন্ত সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে নতুন সরকারের নীতি ও দিশা দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরা হবে।
সরকারের সামগ্রিক লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর সেবা প্রদান, আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা, দুর্নীতি হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। এই লক্ষ্য পূরণে প্রধানমন্ত্রী নিজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা সরকারের কার্যক্রমে গতি ও দক্ষতা নির্ধারণ করবে।