নির্বাচনে ভূমিধস জয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে বিএনপি। মূল দলের সঙ্গে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারাও এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। নেতারা সরকারের দায়িত্ব নেয়ায় ছন্দপতন ঘটেছে সংগঠনে। চিত্র বদলে গেছে দলের নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গুলশানের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের। আগে এই দুই কার্যালয়ে রাতদিন ভিড় করতেন নেতাকর্মীরা। এখন নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ছুটছেন সচিবালয়ে। কেউ কেউ যাচ্ছেন নবনির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রীদের বাসায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেতারা সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর সংগঠন সামলানোর বিষয় নিয়ে এখন নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ এক সঙ্গে দল এবং সরকারের দায়িত্ব পালন কঠিন। বিশেষ করে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে গতিশীল রাখতে সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব দরকার। দলের শীর্ষ নেতারাও বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন।
সামনে বিএনপি’র অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষকদল এবং ছাত্রদলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে এমন ইঙ্গিতও মিলছে। এই চার অঙ্গসংগঠনে সাংগঠনিক স্থবিরতা বিরাজ করছে। সাংগঠনিক অনেক সিদ্ধান্ত আটকে আছে। এরমধ্যে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষকদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করেছেন। একজন ব্যতীত সবাই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে মন্ত্রিত্বও পেয়েছেন। সরকারি কাজের ব্যস্ততার কারণে এখন তারা অফিসমুখী হতে পারছেন না। তাদের অনুপস্থিতিতে নেতাকর্মীরা সংগঠনমুখীও হচ্ছেন না। সবাই এখন সরকারমুখী। অনেকেই সচিবালয় ও মন্ত্রীদের বাসায় বাসায় শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন। এসব কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা রাজপথে আন্দোলন ও সংগ্রামে ভূমিকা রাখা ত্যাগীদের দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের কথা বলছেন। একই সঙ্গে সামনে বিরোধী দলগুলোর সম্ভাব্য আন্দোলনের বিষয়ও মাথায় রাখার তাগিদ দিচ্ছেন কেউ কেউ।
চার সংগঠনের কয়েকজন শীর্ষ ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিনের। তারা জানিয়েছেন, জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষকদল এবং ছাত্রদলের তৃণমূল এবং বর্তমান কমিটির নেতারাও নতুন কমিটি চাইছেন। কারণ বিএনপি’র সরকার গঠনের পর থেকেই নেতাকর্মীদের অনেকে আর রাজনীতি ও সংগঠনমুখী নন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধা নিয়ে এখন ভাবছেন। এ কারণে ঢাকাসহ সারা দেশে সংগঠনগুলোর কার্যক্রম এখন স্থবির। সবাই নতুন নেতৃত্বের জন্য মুখিয়ে আছে।
২০২৪ সালের ৯ই জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। দেড় বছরের অধিক সময় পার হলেও যুবদলের আংশিক ঘোষিত কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। ছয় সদস্যের আংশিক কমিটি দিয়েই কেন্দ্রীয় যুবদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। এরমধ্যে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
ওদিকে ২০২২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর এস এম জিলানীকে সভাপতি ও রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এরমধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন।
যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং কৃষকদলের সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সংসদ নির্বাচনের আগেই সাংগঠনিক গতিশীলতা আনতে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই তিন অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন। তবে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং কৃষকদল থেকে নির্বাচনের জন্য দলের মনোনীত প্রার্থীরা হাইকমান্ডের কাছে ভোটের আগে কমিটি না ভাঙার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সবকিছু বিবেচনা করে বিএনপি’র হাইকমান্ড ওই সময় কমিটি ভেঙে কমিটি গঠন করেননি বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান মানবজমিনকে বলেন, সবকিছুই পরিবর্তন হবে। নেতৃত্বেরও পরিবর্তন আসবে। এক জায়গায় সবাই থাকবে না। আমরা যতদিন দায়িত্বে আছি, ততদিন আমরা আমাদের দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করবো এবং কাজ করবো। দল যদি নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসে আমরা তাকে স্বাগত জানাবো।
অন্যদিকে ২০২১ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতাই সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করেছেন। এরমধ্যে শহিদুল ইসলাম বাবুল নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন।
ওদিকে ২০২৪ সালের ১লা মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। আগামী ১লা মার্চ ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হবে। তবে বর্তমান কমিটি গঠনের পর থেকেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সুপার ফাইভের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গ্রুপিং ও সমন্বয়হীনতার কারণে সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবির কারণে ছাত্রদলের চেইন অব কমান্ডও ভেঙে পড়েছে।
শহিদুল ইসলাম বাবুল মানবজমিনকে বলেন, নতুন কমিটির বিষয়ে কিছু জানি না। তবে দল মনে করলে নতুন কমিটি করবে। নাছির উদ্দিন নাছির মানবজমিনকে বলেন, ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কমিটি গঠনের বিষয়ে উনি সিদ্ধান্ত নেবেন।
নয়াপল্টনে ভিড় কমেছে, সচিবালয়মুখী নেতাকর্মীরা: ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জেল, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন এবং দমন-পীড়নের সময়ও সরব ছিল রাজধানীর নয়াপল্টনের বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এখন দলের সুসময়ে নেতাকর্মীর ভিড় আগের চেয়ে কমেছে। বিএনপি’র কার্যালয়ে কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমপি-মন্ত্রী হওয়া নেতারা এখন কম আসছেন। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বে থাকা দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অসুস্থ। সেজন্য তিনি কার্যালয়ে আসছেন না। গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান। ওইদিন নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল। পরের দিন অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি দলের গুলশানের কার্যালয়েও আগের মতো ভিড় নেই। তবে কিছু নেতাকর্মী এখন সচিবালয়মুখী হয়েছেন। তারা ফুল নিয়ে মন্ত্রীদের শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ কোনো কারণ ছাড়াই এলাকার পরিচয়ে মন্ত্রীদের দপ্তরে যাচ্ছেন।