ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। নির্বাচনের পরপর সরকারে যাচ্ছে এমন একটি বড় দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্যান্য দলের প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়টিতে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন তারা, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আশার সঞ্চার করেছে। এটি অব্যাহত রাখা গেলে সবার জন্য বসবাস উপযোগী মানবিক দেশ পাবে সবাই। অংশগ্রহণমূলক ও প্রায় সংঘাতমুক্ত ভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে দেশের তরুণ সমাজ এভাবে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন প্রজন্মের আস্থা, অংশগ্রহণ ও সন্তুষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে তরুণদের বক্তব্যে। তারা বলছেন, শুধু সরকার পরিবর্তনই নয়; শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক সংস্কার চলমান রাখতে হবে।
নির্বাচনি ইশতেহারে এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি রয়েছে বিএনপির। তরুণদের মতে, এই প্রতিশ্রুতি আশাব্যঞ্জক। তবে এর জন্য দরকার বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রী নাশিতা যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যৎ বিরোধী দলের নেতার বাসায় গিয়ে যে রীতি তৈরি করেছেন তা আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখান থেকে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির যাত্রা শুরু হয়েছে বলে আমি মনে করি। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ট্যাগিং-ফ্রেমিং থেকে নিষ্কৃতির আভাস মিলছে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস’র (বিইউপি) শীক্ষার্থী মাসরুরা ইসলাম বলেন, নতুন সরকার এক কোটি কর্মসংস্থান কোন খাতে, কীভাবে, কত সময়ে করবে-এই প্রতিশ্রুতির একটি বাস্তব রূপরেখা দরকার। তার মতে, আমাদের অর্থনীতি এখনো গার্মেন্টস আর রেমিট্যান্সনির্ভর। মৎস্য, পাট, কুটিরশিল্প কিংবা কৃষি অর্থনীতিকে আধুনিকায়ন না করলে টেকসই কর্মসংস্থান সম্ভব নয়।
তরুণদের কাছে উদ্বেগের বিষয় নতুন নেতৃত্বের সংকট। উন্নত বিশ্বে পরিকল্পিতভাবে ‘নেক্সট জেনারেশন লিডার’ তৈরি করা হয়। তরুণদের হাতে ধাপে ধাপে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এমনকি ভুল করার ক্ষেত্রও রাখা হয়। কারণ সেই ভুল থেকেই শেখার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রায়ই দেখা যায় তরুণদের প্রতি অনাস্থা, অভিজ্ঞদের পক্ষ থেকে দায়িত্ব হস্তান্তরে অনাগ্রহ কিংবা ‘ওরা কী বুঝবে’ ধরনের মানসিকতা। অথচ নেতৃত্বের গ্রুমিং কোনো তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়া নয়। এটি প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের ধারাবাহিক চর্চার ফল। এই বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হয় না। বরং এক সময় নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়।
মাসরুরা ইসলাম বলেন, আমাদের দেশে তরুণদের নীতিনির্ধারণের অংশ হিসাবে না দেখে শুধু কর্মী হিসাবে দেখা হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই যদি নেতৃত্ব বিকাশের কাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া যায় যেমন-ডিবেট, পলিসি সিমুলেশন, গবেষণা প্রকল্প বা প্রশাসনিক ইন্টার্নশিপ। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে দক্ষ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব তৈরি করা সম্ভব। অভিজ্ঞদের সঙ্গে তরুণদের যৌথ কাজের সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। শুধু বয়সের কারণে কাউকে অযোগ্য ভাবা ঠিক নয়। সুযোগ না দিলে দক্ষতা প্রমাণের সুযোগও আসে না।
জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এখনো তরুণদের স্মৃতিতে তাজা। তরুণদের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা-জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি কার্যকর জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। তাদের ভাষ্য, অতীতের বিভাজন ও সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে।
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান জেরিন বলেন, আমরা চাই নতুন সরকার জুলাই হত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে দ্রুত শেষ করুক। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে ক্ষোভ থেকে যাবে। সেই ক্ষোভ ভবিষ্যতে আবার অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না। যারা অন্যায় করেছে তাদের শাস্তি হোক। কিন্তু দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে টার্গেট করা বন্ধ করতে হবে। দেশে একটি জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়া শুরু হওয়া দরকার, যাতে সবাই নিরাপদ ও সমান নাগরিক হিসাবে বোধ করতে পারে। তার মতে, নতুন সরকার যদি সত্যিকার অর্থে পরিবর্তনের বার্তা দিতে চায়, তাহলে প্রথমেই আইনের শাসন ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা অতীত নিয়ে আটকে থাকতে চাই না। একটি স্থিতিশীল, উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ দেখতে চাই।
জুলাই আন্দোলনের পর গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্ম আপ-বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য সাজ্জাদ সাব্বির বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে সুস্থধারার রাজনীতি, কার্যকর গণতন্ত্র এবং সহাবস্থানের সংস্কৃতি কেবল স্লোগানে নয়, বাস্তবেও প্রতিষ্ঠিত হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে যে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে, তা যেন সাময়িক উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতায় রূপ নেয়-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পরিসর আরও বিস্তৃত হোক, তরুণদের মত ও নেতৃত্বের জায়গা সুদৃঢ় হোক।
শিক্ষার্থী তানভীর হোসেন বলেন, আমরা আর অতীতে ফিরতে চাই না। কিন্তু জুলাই হত্যার বিচারের ব্যাপারে আমরা অটল। তার মতে, প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করতে একটি জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়া দরকার। রাজনীতি মানেই শত্রুতা-এই ধারণা থেকে বের হতে হবে। নতুন সরকার যদি সহনশীলতা দেখাতে পারে, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসবে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইমরান হোসেন বলেন, দীর্ঘ বছর পর আমরা ভোট দিতে পেরেছি। সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসছে। আমরা আশা করি, সরকার প্রযুক্তির উন্নয়নকে প্রাধান্য দেবে এবং ডিজিটাল স্পেসে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। এআই নীতিমালাও বাস্তবায়ন করবে।
তরুণদের মতে, শিক্ষানীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এই ধারণা বাস্তবায়ন করতে হলে পাঠ্যক্রমে দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো যুক্ত করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের (স্নাতক) শিক্ষার্থী আরাফাত বাপ্পি বলেন, আমরা ১৮-২০ বছর পড়াশোনা শেষ করে চাকরির বাজারে গিয়ে দেখি বাস্তব দক্ষতার ঘাটতি। তাই শিক্ষা যেন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়, সেটাই আমাদের চাওয়া। তিনি বলেন, শুধু সনদ নয়, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রণোদনা কর্মসূচিকেও তরুণরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে তারা আশঙ্কা করছেন, সঠিক মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা না থাকলে দলীয়করণ ও দুর্নীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বরিশালের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাফিয়া ইসলাম বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ না হলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বাদ পড়তে পারেন। গ্রামীণ নারীদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণও দিতে হবে। তার মতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো ডিজিটালাইজড হলে একদিকে দুর্নীতি কমবে, অন্যদিকে জবাবদিহি বাড়বে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তরুণদের প্রত্যাশা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মতাদর্শের চর্চা থাকবে, কিন্তু সহিংসতা নয়। তারা চান মেধার চর্চা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ বিরাজ করুক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা এমন ক্যাম্পাস চাই যেখানে রাজনীতি থাকবে মতাদর্শের ঊর্ধ্বে। সহিংসতা আর দেখতে চাই না। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক বিতর্কে না জড়ানোর দাবি তাদের।