সরকারি হাসপাতাল যেন লুটপাটের স্বর্গ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একের পর এক সাতটি অভিযানে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। দেখা গেছে স্বাস্থ্য খাতের ভয়াবহতা, অমানবিকতা এবং নৈরাজ্যকর অবস্থা। দুদকের অভিযানে ধরা পড়েছে রোগীকে সুষম খাবার দেওয়া হয় না, অথচ কাগজে কলমে বিল ওঠে পূর্ণমাত্রায়। চিকিৎসক ও নার্সের অনেকেই থাকেন অনুপস্থিত। চিকিৎসকের পরিবর্তে রোগী দেখেন টেকনোলজিস্ট বা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট। সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রি হয়, মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট দিয়ে করা হয় পরীক্ষা, অকেজো যন্ত্রপাতি দিয়েই চলে চিকিৎসা কার্যক্রম।
দুদক সূত্র নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিচালিত অভিযান সম্পর্কে জানিয়েছেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্তব্যে অবহেলা, রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ১৫ জানুয়ারি সেখানে অভিযান চালায় দুদক। প্রথমে ছদ্মবেশে অভিযান পরিচালনা করে সংস্থাটি। এ সময় দেখা গেছে, কর্তব্যরত দুজন চিকিৎসক ও কয়েকজন কর্মচারী কর্মস্থলে অনুপস্থিত। হাসপাতালে ভর্তি ৩৫ রোগীর মধ্যে মাত্র ২০ জনকে খাবার সরবরাহ করা হয়। পুরো হাসপাতালই ছিল অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা।
অভিযান পরিচালনাকারীরা জানান, সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকার নির্ধারিত কর্মঘণ্টা অনুসরণ করছেন না। কেউ সকাল ১০টার পর, আবার কেউ দুপুরের পর হাসপাতালে উপস্থিত হন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয় এবং অভিযানে অভিযোগগুলোর প্রমাণও পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক অভিযানের মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চালানো অভিযানে দুদক নানান অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার সত্যতা পেয়েছে। এসব অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।’
অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ১১১টি সরকারি হাসপাতালে দুদক অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১টি হাসপাতালে রোগীর খাবার সরবরাহে অনিয়ম ধরা পড়েছে, যা মোট অনিয়মের ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২৮ হাসপাতালে দরপত্র ও অন্যান্য আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, যার মধ্যে রয়েছে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গাফিলতি, অতিরিক্ত ফি আদায়, আউটসোর্সিং বেতন আত্মসাৎ ও ভুয়া বিল তৈরি, যা মোট অনিয়মের ২৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২৪ হাসপাতালে ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ধরা পড়েছে, যা মোট অপরাধের ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। ২১ হাসপাতালে চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট অপরাধের ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ছাড়া সাত হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্য, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে যোগসাজশের চিত্র উঠে এসেছে, যা মোট অপরাধের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
দুদক সূত্র জানান, গত ১৯ জানুয়ারি রংপুর ও সিলেট ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপে অভিযানে দেখা গেছে, পুরোনো যন্ত্রপাতিতে নকল স্টিকার লাগিয়ে নতুন হিসেবে সরবরাহ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। ২৩ জানুয়ারি বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে খাবার সরবরাহে অনিয়ম ও হয়রানির প্রমাণ পাওয়া যায়। পিরোজপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ২৭ জানুয়ারি অভিযানে মেলে রিএজেন্ট কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ।
গত বছরের ২৯ জানুয়ারি নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দেখা গেছে, হাসপাতালের ভিতরেই চলছে অনুমোদনহীন বেসরকারি ফার্মেসি। মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একই বছরের ৩০ জানুয়ারি অভিযানে নিম্নমানের খাবার ও কেনাকাটায় দুর্নীতির সত্যতা পায় দুদক।
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা গেছে, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন তুলছেন চিকিৎসক ও কর্মচারীরা। ১০ ফেব্রুয়ারি বিএমইউ প্রিজন সেলে কারাবন্দিদের অবৈধ ভিআইপি সুবিধা দেওয়ার তথ্য বেরিয়ে আসে। পটুয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা আদায় এবং ওষুধ বিতরণে অনিয়ম ধরা পড়ে। টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত বছরের ৪ মার্চ রিএজেন্ট কেনাকাটার দরপত্রে অনিয়ম পায় দুদক। ১৩ এপ্রিল মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভুয়া রোগী ভর্তি দেখিয়ে সরকারি টাকা পকেটে ভরার প্রমাণ মেলে। ১৭ এপ্রিল সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে জনবল নিয়োগে দুর্নীতির চিত্র ফুটে ওঠে। ২২ এপ্রিল হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে চিকিৎসকের বদলে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে রোগী দেখা এবং গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে এক্স-রে ফিল্মের কৃত্রিম সংকট তৈরি, ২৩ এপ্রিল দিনাজপুরের বীরগঞ্জে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় এবং কুড়িগ্রামে সরকারি ওষুধ বিতরণে নয়ছয়ের প্রমাণ মেলে। জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (নিটোর) ২৭ এপ্রিল অভিযানে দেখা যায়, অধিকাংশ জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ২৮ এপ্রিল মিলেছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ।