বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে এখনই নানা আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এসব আলোচনায় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। এ ছাড়া কেউ কেউ দলটির প্রবীণ আরেক নেতা নজরুল ইসলাম খানের নামও বলছেন। তবে সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিএনপির এই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে রাষ্ট্রপতি পদে দেখা যেতে পারে।
নতুন সরকার গঠনের পর বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন। গত ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি নিজেই এমনটি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, আমি সরে যেতে চাই। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ৭৫ বছর বয়সি মো. সাহাবুদ্দিন। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ-সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন।
বর্তমান সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে উক্ত পদ শূন্য হলে মেয়াদ সমাপ্তি তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ হতে ৬০ দিনের মধ্যে শূন্যপদ পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ-সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হলেও মূলত রাষ্ট্রপতি কে হবেন সে সিদ্ধান্তের বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যাকে চাইবেন বা মনোনয়ন দেবেন তিনিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। তবে দলের প্রবীণ নেতাদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি করার উদাহরণই বেশি। সে হিসাবে দলের স্থায়ী কমিটিতে সিনিয়র নেতা ৭৯ বছর বয়সি খন্দকার মোশাররফ হোসেন। কুমিল্লা-১ আসন থেকে এবার তিনি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার মোশাররফ কুমিল্লা থেকে আরও চারবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দলের জন্য তার অবদানও কম নয়। শত বিপর্যয়ের মধ্যেও প্রবীণ এই নেতা দল ছেড়ে যাননি। বিএনপি ভাঙারও ঝুঁকি নেননি। বেশ কয়েকবার তিনি কারাবরণ করেছেন। সর্বশেষ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়া খন্দকার মোশররফের জীবনের শেষ নির্বাচন বলে মনে করা হচ্ছে।
বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে খন্দকার মোশাররফ হোসেন রাষ্ট্রপতি হতে পারেন বলে আগেও আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালে বগুড়ায় বিএনপির একটি বিভাগীয় সমাবেশে দলটির এক সিনিয়র নেতা বলেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে তারেক রহমান হবেন প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রপতি হবেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এদিকে বিএনপির একটি সূত্র বলছে, খন্দকার মোশাররফ দলের কার্যক্রম থেকে নিজেকে কিছুটা আড়ালে রেখেছেন, যাতে তাকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি না হয়।
অন্যদিকে, সর্বশেষ নির্বাচনে অংশ নিয়ে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও জানিয়েছেন, এটাই তার শেষ নির্বাচন। দলটির এক যুগের বেশি সময় মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকারী এই নেতা হাসিনা সরকারের আমলে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বেশি জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন। শেখ হাসিনা এবং বিদেশি শক্তির অনেক চাপ ও প্রলোভন সত্ত্বেও তিনি বিএনপি ভাঙতে বা দলটির নেতৃত্ব নিতে রাজি হননি। এক-এগারোর পর বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া খালেদা জিয়াকে মাইনাস করে দলের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিলেন। দেশের রাজনীতিতে আলোচনা আছে, মির্জা ফখরুলকেও এ ধরনের নানা প্রলোভন দেওয়া হলেও তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এজন্যই বারবার তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। এছাড়া অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও ফখরুলের মতো নেতার কারণেই বিএনপিকে ভাঙা যায়নি-এমন আলোচনা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে দেশের রাজনীতিতে। ক্লিন ইমেজের নেতা হিসাবে তিনি বিএনপির ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে প্রশংসিত। ফলে তিনি চাইলে বা ইচ্ছা পোষণ করলে রাষ্ট্রপতি হতে পারেন এমনটি অনেকেই বিশ্বাস করেন। তবে সাদাসিদে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ফখরুল এমনটি চাইবেন কিনা সে বিষয়টি নিশ্চিত নন তার ঘনিষ্ঠরাও।
সূত্র আরও জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামটিও আলোচনায় রয়েছে। দলের মধ্যে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য এই নেতা প্রয়োজনে যেকোনো বিবৃতি বা ড্রাফট তৈরিতে সিদ্ধহস্ত। ভালো বক্তা হিসাবেও তিনি পরিচিত। রাষ্ট্রপতি করা না হলে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করার পরামর্শ রয়েছে দলের ভেতর থেকে। আবার কেউ কেউ তাকে সংসদের স্পিকার করার কথাও বলছেন। খালেদা জিয়ার জানাজায় বিপুল জমায়েতে দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন নজরুল ইসলাম খান। এবার বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। আজ সকালে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ। বিকালে মন্ত্রিসভার শপথ হবে। মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে বিএনপির ভেতরে আলোচনা চলছে। সামনে আসছে অনেকের নাম। বেশ কিছু নেতা মন্ত্রী হচ্ছেন, সেটিও প্রায় চূড়ান্ত। এর সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে।
নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আজ মন্ত্রীদের নাম জানা যাবে। এর কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হতে পারে, কে হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি।