জনপ্রশাসনে প্রাইজ পোস্টিং নিয়ে একধরনের ঠান্ডা লড়াই চলছে। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং নিতে একরকম অদৃশ্য ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনে নানাভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা কর্মকর্তাদের অংশবিশেষ এ ধরনের সুবিধাবাদী অপচেষ্টায় লিপ্ত। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন দলমতনিরপেক্ষ পেশাদার কর্মকর্তারা। সেভ জোনে আছেন রাজনীতিসংশ্লিষ্ট দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা। যারা সব সময় সরকারি দল হিসাবে পরিচিত। তবে নতুন করে বদলি আতঙ্কে আছেন আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তারা। আর যারা জামায়াত-শিবির হিসাবে চিহ্নিত, তাদের চেয়ারও নড়াচড়া শুরু হয়েছে। সচিবালয় প্রশাসনে ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রগুলো জানায়, শুধু সচিবালয় নয়, সরকারি চাকরির প্রতিটি কর্মস্থলে কমবেশি এমন চর্চা পর্দার আড়ালে শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে থেকে কম মাত্রায় শুরু হলেও ভোটের পর যে যার শক্তিমত্তা দেখাতে মাঠে নেমেছেন। এ সারির সুবিধাবাদী কর্মকর্তারা প্রাইজ পোস্টিংয়ের একাধিক বিকল্প পদে পোস্টিং নিতে চেষ্টা-তদবির করে যাচ্ছেন। এজন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে ট্যাগ দেওয়ার সেই পুরোনো অপকৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা ম্যানেজ করে টিকে গেছেন, তারা তেমন একটা বিপদে নেই। বড়জোর পদোন্নতি আটকে গেছে, কেউ কেউ মধ্যমানের পোস্টিংও পেয়েছেন। বেশি দিন ওএসডি থাকতে হয়নি। আর যারা বেশি ধূর্ত, তাদের কেউ কেউ এখন বিএনপি সেজে ভালো পোস্টিংও হাতিয়ে নিয়েছেন। তারা বলেন, যারা প্রকাশ্যে বিএনপিপন্থি আমলা হিসাবে পরিচিত, তারা আবার তিন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। প্রথম ক্যাটাগরিতে খুবই মেধাবী, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা; দ্বিতীয়ত, মেধা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনীতিচর্চায় বেশি পটু এবং তৃতীয়ত, রাতারাতি বিএনপি বনে যাওয়া সুবিধাবাদী গ্রুপ। মূলত প্রাইজ পোস্টিং নিয়ে বর্তমানে এই তিন শ্রেণির কর্মকর্তাদের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই বেশি।
অপরদিকে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ অচেনা এবং পেশাদার আমলা হিসাবে পরিচিত। অনেকে ওপরে বিএনপি সমর্থন করলেও ভেতরে-ভেতরে জামায়াত। হাতে গোনা কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা জামায়াতপন্থি বলে চিহ্নিত। সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন প্রভাবশালী সমন্বয়কের তদবির-সুপারিশে যেসব কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং পান, তাদের বেশির ভাগ ছিলেন সুপ্ত বা লুক্কায়িত জামায়াত। এমন অভিযোগ প্রশাসনে শুরু থেকে চাউর ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন পুরো প্রশাসন জামায়াতপন্থিদের কবজায় চলে যেতে থাকে, তখন ঘুম ভাঙে বিএনপির। কিন্তু তখন নানা চেষ্টা করেও তাদের শক্ত বাঁধ ভাঙা সম্ভব হয়নি।
শুরুর দিকে গাজী সালাউদ্দিন তানভীর নামে এক ব্যক্তি নিজেকে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে সারাক্ষণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ে বসে থাকতেন। অবাক হলেও সত্য, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওই সময়কার সিনিয়র কর্মকর্তারা তার তদবিরে থাকতেন তটস্থ। অভিযোগ আছে, ওই তানভীরই ডিসি থেকে শুরু করে প্রশাসনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রধান হোতা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে যিনি এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক হন। যদিও গুরুতর অভিযোগে পরে তাকে এনসিপি থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়।
এদিকে গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পর বিএনপির কাছে যখন ভুলের ক্ষত আরও স্পষ্ট হয়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। উপদেষ্টারাও তখন তিন গ্রুপে বিভক্ত। ফলে বেশির ভাগ প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়। যার সুযোগ নেয় একশ্রেণির সুবিধাবাদী আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তারা। তারা প্রশাসনে বিএনপি-শিবিরকে কোণঠাসা করতে নিজেদের জুলাই যোদ্ধাসহ এনসিপিপন্থি হিসাবে জাহির করেন। এমনকি তারা পরামর্শ দেন-প্রশাসনে এনসিপিপন্থি কর্মকর্তাদের কমিটি গঠনসহ শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে হবে। এসব কারণে প্রশাসনজুড়ে একধরনের অস্বস্তি ও অচলাবস্থা পরিলক্ষিত হয়।
দলমতনিরপেক্ষ পেশাদার কর্মকর্তাদের অনেকে তাদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে জানান, প্রশাসন দলীয়করণের খেলায় ইতোমধ্যে দেশ ও প্রশাসনের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এবার এই বাজে সংস্কৃতি থেকে সবাইকে একযোগে বেরিয়ে আসতে হবে। এমন কিছু করা হোক যেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড ধরা হয়। এছাড়া তারা বলেন, প্রাইজ পোস্টিং মানে ধরে নেওয়া হয়-যে পদে বসে অতি ক্ষমতাবান হয়ে নির্বিঘ্নে দুর্নীতি করা এবং ঘনঘন বিদেশ সফরের সুযোগ। কিন্তু এই ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রাইজ পোস্টিং হিসাবে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো যেন জনগণের সেবা দেওয়ার বড় পদ হিসাবে বিবেচিত হয়, দায়িত্বশীলদের সে ব্যবস্থা এখনই নিশ্চিত করতে হবে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন ডিআইজি খুবই হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘ভাই লিখে কিছু হবে না। বাস্তবে দেখবেন সৎ, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের কীভাবে কোণঠাসা করা হয়। আমার ১৭ মাসের কাজের মূল্যায়ন না করে রাতারাতি একটা পলিটিক্যাল ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হবে। এরপর দেখবেন আমার চাকরি নেই, অথবা খুবই কম গুরুত্বপূর্ণ পদে ডাম্পিং করে রাখা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এসব অনাচারের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের নীতিনির্ধারকরা যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী সহকর্মী ও ব্যাচমেটদের প্রতিহিংসা।’