নিম্নমানের কর আদায়, খেলাপি ঋণ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা গেঁথে আছে অর্থনীতিতে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। এর আঘাতে একই সময়ে কমছে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়ও। অন্যদিকে কর আদায় নিম্নমানের হচ্ছে। যে কারণে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি বাজেটের ঘাটতি মেটাতে নির্ভরতা বাড়ছে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর। বিপুল অঙ্কের ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে বড় ধরনের চাপের মুখে আছে অর্থনীতি। নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য রেখে যাওয়া উত্তারাধিকার নোটে সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা তুলে ধরেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
উত্তারাধিকার নোটে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজারব্যবস্থায় আস্থা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে বলেছেন উপদেষ্টা। জোর দিতে বলেছেন রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর দিকে। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চলমান সংস্কার বাস্তবায়ন ও কর অব্যাহতি পর্যালোচনাসহ আয়কর ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশন ও কাস্টমস আধুনিকায়নে নজর দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন।
বুধবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। এর আগে আজ নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপি। শপথের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বিগত সময়গুলোয় বলতেন, নতুন সরকারের জন্য রাস্তা তৈরি করে যাবেন, যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে পারবে। সদ্যবিদায়ি অনুষ্ঠানেও তিনি বলেছেন, নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য কয়েক পৃষ্ঠার সাকসেসর বা উত্তরাধিকার নোট রেখে যাবেন, যাতে দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজ এগিয়ে নিতে সুবিধা হয়। তার মতে, পরবর্তী সরকারের উচিত হবে নতুন কাজ শুরুর বদলে চলমান সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা।
উত্তরাধিকার নোটে কী লিখে রেখেছেন অর্থ উপদেষ্টা, তা যুগান্তরের হাতে এসেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির প্রবণতা ও রাজস্ব খাতের অবস্থা। এছাড়া মুদ্রা ও আর্থিক খাত, বৈদেশিক খাত ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের চলমান কর্মসূচির কথাও উঠে আসছে। আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনৈতিক খাতের প্রধান সংস্কার প্রতিশ্রুতি ও চলমান কর্মসূচি, সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং অগ্রাধিকার বিষয়গুলো।
যদিও এটি উত্তরাধিকার নোট হিসাবে উল্লেখ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা। কিন্তু ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং নীতি-অগ্রাধিকার’ শীর্ষক নামে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে অর্থ বিভাগ; যা নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করবেন অর্থ বিভাগের সচিব।
ব্যাংক খাত নিয়ে যা বলা হয়েছে : অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা পেয়েছেন দেশের ব্যাংক খাতে। সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপিডি) গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়, ২০০৮-২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ব্যাংক খাতের দেওয়া মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের। নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতকে নিয়মের মধ্যে এনে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দেওয়া। যাতে নতুন করে আর কোনো অনিয়ম না হয়।
এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা রেখে যাওয়া নোটে বলেছেন, গত সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ও ঋণের সুদহার বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলেও খেলাপি ঋণ, পুঁজি ঘাটতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা রয়ে গেছে। আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রবৃদ্ধি গত নভেম্বরে কমছে। এটি বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
সেখানে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার মুদ্রা ও আর্থিক খাতের নতুন অনেক আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে। প্রণীত ও সংশোধিত আইনগুলোর মধ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন (সংশোধন), ফিন্যান্স কোম্পানি আইন এবং সিকিউরড ট্রানজেকশন আইন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, অর্থ ঋণ আদালত আইন (সংশোধন) রয়েছে। এছাড়া আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ অন্যতম। ঝুঁকিপূর্ণ বা ব্যর্থ ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানে ব্যাংক রিসলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ কার্যকর করা হয়েছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যর্থ বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের রিসলিউশনের পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ব্যাংক রিসোলিউশন ইউনিট গঠন করা হয়েছে, যাতে সংকটাপন্ন ব্যাংকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা যেতে পারে। ব্যাংক রিসলিউশন প্রক্রিয়ায় ছোট আমানতকারীর সুরক্ষা ও ব্যাংকিং সেবার ধারাবাহিকতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করতে হচ্ছে, যা সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের বোঝা।
তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার : সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি বিষয়ে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা তার নোটে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যবস্থাপনা সুচারুরূপে সম্পন্ন, বাজার পর্যবেক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চলমান সমস্যা দূরীকরণ এবং সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার বিষয়টি রয়েছে। এছাড়া রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েস চালু করার কথাও বলা হয়।
মূল্যস্ফীতি কমার প্রত্যাশা : ঊর্ধ্বমুখী মূল্যম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা একধরনের গলদ্গর্ম হয়ে পড়েছেন। নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তবে আগামী জুনে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের কাছাকাছি আসবে বলে প্রত্যাশা করে গেছেন তিনি। এর মূল কারণ হিসাবে তিনি বলেছেন, সরকারের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কৃচ্ছ সাধনের ফলে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। সেখানে আরও বলা হয়, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসছে।
বৈদেশিক খাত : বৈদেশিক খাত প্রসঙ্গে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির প্রবৃদ্ধি হলেও রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বেশ কমছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে আশানুরূপ উৎপাদন না হওয়ায় মোট রপ্তানির প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।