Image description

রাজিব আহমদ

অব্যহত মিথ্যাচার, গুজবের পরও গণভোটে ৬৮.২ শতাংশ মানুষ হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। বিএনপি জোট নির্বাচনে ৫১.১ দশমিক শতাংশ ভোট পেয়েছে। সুন্নী জোট, জাতীয় পার্টি, বাম দলসহ অনেকে প্রকাশ্যে 'না' ভোটে পক্ষে ছিল। তাদের সম্মিলিত ভোট ২ শতাংশ। জামায়াত জোট পেয়েছে ৩৮.৫ শতাংশ ভোট। জামায়াত জোটকে ভোট দেওয়া সব ভোটারও যদি, হ্যাঁ ভোট দিয়ে থাকেন, তারপরও আরও ৩০ শতাংশ ভোটার হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা জামায়াত জোটকে ভোট দেননি। বিএনপি, স্বতন্ত্র বা অন্য কাউকে ভোট দিয়েছেন। সুতরাং হ্যাঁ ভোট শুধু জামায়াত-এনসিপির নয়।

ফলাফল বলছে, স্বতন্ত্র এবং ইসলামী আন্দোলনকে ভোট দেওয়া ৭ শতাংশ ভোটারের সবাই যদি হ্যাঁ ভোট থাকেন, তাহলেও হ্যাঁ ভোট দেওয়া কমপক্ষে ২৩ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। যা বিএনপি প্রাপ্ত ভোটের ৪৫ শতাংশ। আর যদি অন্যান্য দলকে ভোট দেওয়া, কিছু ভোটারও যদি হ্যাঁ ভোট দিয়ে থাকেন, তাহলে ধানের শীষে ভোট দেওয়া ভোটারের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। ফলে গণভোটকে অস্বীকার করা হবে- রাজনৈতিক আত্মহত্যা।

নির্বাচনে কে জিতবে- এ নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা ছিল না। থাকার কারণও নেই। হ্যাঁ ভোট যেনো জিতে- এটাই ছিল আমার একমাত্র কামনা। গণভোটে হ্যাঁ জিতেছে। আমি খুশি। এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে- এটাই চাই। জুলাই সনদের সঙ্গে গাদ্দারি করলে ফল ভালো হবে না।

জুলাই সনদ আসমানি কিতাব নয়। এতে অনেক লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। যেমন, গোয়েন্দা সংস্থার ও জনপ্রশাসনের সংস্কার করা যায়নি। কেনো করা যায়নি- তা রিপোর্টার হিসেবে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। যেমন পুলিশ সংস্কার সংলাপ শুরুর দুই মাসেও তোলা সম্ভব হয়নি। কারণ, আমলারা আটকে রেখেছিল। তারা চায়নি, পুলিশের অনিয়ম-অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিশন হোক। তাতে নাকি পুলিশের ওপর আমলাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না! দেশ চালানো যাবে না!

গত ২৭ জুলাই শেষ পর্যন্ত ড. ইউনূসের চাপে, পুলিশ কমিশনের প্রস্তাব সংলাপে উঠে। রাজনৈতিক দলগুলো আধাঘণ্টায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা অনুমোদন করে। প্রস্তাবটি ছিল, একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকারের প্রতিনিধি হিসেবে চারজন এমপিসহ ৯ সদস্যের কমিশন হবে। বাকিরা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসবেন (সনদ : ৬৭)। এই কমিশনের কাছে যে কোনো নাগরিক অভিযোগ জানাতে পারবেন। আবার যে কোনো পুলিশ সদস্যও অভিযোগ জানাতে পারবে। কমিশন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে যে সুপারিশ করবে, তা বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অনুমোদনের পরও, পুলিশ কমিশন গঠনের অধ্যাদেশে এগুলো কিছুই রাখা হয়নি। কারা রাখেনি? আমলারা। কেনো রাখেনি? কারণ এটা হলে নাকি আমলাতন্ত্রের আর দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। দুঃখজনক হল, সংলাপে অনুমোদন করলেও শেষ পর্যন্ত আমলাদের পক্ষে দাঁড়ায় বিএনপি। বিবৃতি পর্যন্ত দেয়। ফলে কমিশন গঠনে যে অধ্যাদেশ হয়েছে, তা গুড ফর নাথিং। শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা যেহেতু নেই- তাই এটা একটা অকার্যকর কমিশন। আবার এমপিদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে কমিশন থেকে।
অনেক কিছু করা সম্ভব না হলেও, জুলাই সনদে যতটুকু আছে, এটুকু বাস্তবায়ন হলেও বাংলাদেশকে আর স্বৈরশাসন আসবে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে পর, শেখ হাসিনাকে আবারও দেশের প্রধানমন্ত্রী বানালেও ক্ষতি হবে না।

কেনো হবে না- এটা দীর্ঘ আলাপ। সারাংশ হল, প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ না করতে পারলে; নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন হলে; কোন দল ক্ষমতায় থাকল, কে প্রধানমন্ত্রী তাতে খুব বেশি কিছু যায় আসে না। সরকার খারাপ করলে, ৫ বছর পর জনগণ বিদায় করে দেবে। এটাই জুলাই সনদ।

কেউ কেউ বলছেন, সংবিধানে গণভোট নেই, গণভোটের আইনী ভিত্তি নেই। এটা এক অর্থে ঠিক কথা। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, গত দেড় বছরে যা হয়েছে, এর কিছুই সংবিধানে নেই। যদি ধরেও নিই আদালতের পরামর্শের কারণে ইউনূস সরকার বৈধ, তারপরও দেড় বছরের প্রায় সব কাজ অসংবিধানিক। কারণ, কোনো সংসদ ছাড়া অন্য কারো বাজেট প্রণয়ন, রাষ্ট্রের টাকা খরচের এখতিয়ার নেই। অন্তর্বর্তী সরকার যে নির্বাচন আয়োজন করেছে টাকা খরচ করে, সেটাও এ কারণে অবৈধ। সংবিধান মানলে, এর বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।

কিন্তু যা কিছু হয়েছে, তা জুলাই অভ্যুত্থানে জনগণের ব্যক্ত করা সার্বভৌম অভিপ্রায়ে হয়েছে। জনগণের অভিপ্রায়ই সংবিধান, সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণ গণভোটে অংশ নিয়েছে। এটাই গণভোটের বৈধতা। সুতরাং গণভোটে যে রায় এসেছে, তা মেনে নিন।

জনগণ হ্যাঁ ভোট দিয়ে, খুবই স্পষ্ট ও পরিষ্কার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তাঁরা জানিয়েছে, গণভেটের ব্যালটে বর্ণিত উপায়েই সনদ চায়। যারা বলেছিল, 'জনগণ এগুলো বোঝে না'। তাদের মুখে চপেটাঘাত করেছে। অনেক বুদ্ধিজীবী জ্ঞানী মানুষ গণভোটকে জটিল বলে প্যাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে খুবই সহজ ও সরল বলেই মানুষ হ্যাঁ ভোট দিয়েছে।

গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের ওপর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, উচ্চকক্ষ ও সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত ৮টি সংস্কার প্রস্তাব জুলাই সনদে যেভাবে আছে, গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় সেভাবেই করতে হবে। কারো নোট অব ডিসেন্ট প্রযোজ্য হবে না- শুধুমাত্র এই ৮টি ক্ষেত্রে। কারণ, এই নোট অব ডিসেন্টের জন্যই গণভোট হয়েছে। জনগণের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এগুলো চান কি, চান না? দেশের মালিক হিসেবে জনগণ বলেছে, চাই। কথা এখানেই শেষ।

কেউ কেউ জেনে বুঝে উচ্চকক্ষকে ক্ষমতার ভাগাভাগি বলে অপপ্রচার করছেন। আসলে উচ্চকক্ষের একমাত্র কাজ হচ্ছে, সংস্কার করা সংবিধানকে রক্ষা করা। যাতে আর স্বৈরাচার তৈরি না হয়। এ জন্যই জনগণ হ্যাঁ ভোট দিয়েছে।

পরের ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে সব দল একমত ছিল। এগুলোও বাস্তবায়ন বাধ্যতাবমূলক। গণভোটের ব্যালটে তা লেখা ছিল। মানুষ তা গ্রহণ করেছে। বাকি ১০টি প্রস্তাবে নানা দলের নোট অব ডিসেন্ট আছে। এগুলো বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক না। যেমন প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রধান পদে থাকতে পারবেন। গণভোটে বলা হয়েছিল, হ্যাঁ জিতলেও এগুলো বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক না।

আরেকটা জিনিস বলা হয়েছিল, সংস্কার বাস্তবায়ন করবে নতুন এমপিদের নিয়ে গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ। এজন্য এমপিরা পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবেন।

খুব সিম্পল। গণভোটে যে জিনিস পাস হয়েছে, তা মানতে না চাইলে তো গণতন্ত্রই থাকে না। ধরুন, কোনো অফিসের দুইজন কর্মচারী একটা কাজ দুইভাবে করতে চায়। তারা একমত হতে না পেরে, মালিকের কাছে সিদ্ধান্ত নিতে। মালিক যেভাবে বলবে, কাজটা তো সেভাবেই করতে হবে। জনগণ দেশের মালিক হিসেবে, কীভাবে সংস্কার করতে হবে, তা বলে দিয়েছে।