ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে যত আসন পেয়েছে, তা আগে আর কখনও পায়নি। এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এককভাবে ৬৮টি সংসদীয় আসনে জয় পেয়েছেন। জামায়াতসহ তার নেতৃত্বাধীন জোট মোট ৭৭টি আসন নিয়ে এবার প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের শপথ গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনের ফলই বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে জামায়াতের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু এটি দেশের জন্য ‘দুর্ভাগ্যজনক’। আর বিরোধী দলে কোনও নারী সংসদ সদস্য না থাকা নিয়ে নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, সংরক্ষিত আসনে যারা আসবেন, নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের উচিত হবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো।
গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজধানী ঢাকায় কোনও আসন পেতে সক্ষম হলো। এবার তারা রাজধানী ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০১১ সালে শীর্ষ নেতাদের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কারণে দল হিসেবে কতটা এগোবে, সে সন্দেহ রয়েছে। যদিও কেবল দেড় দশকের ব্যবধানে দেশের প্রধান দুটি দলের একটি হিসেবে ৭৭টি আসন নিয়ে সংসদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিয়ে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল জামায়াত।
ইতিহাসের পাতায় জামায়াত
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অবস্থানে ছিল জামায়াতে ইসলামী। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অস্তিত্ব দৃশ্যত বিলীন হয়ে যায়। এ অবস্থায় দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অনেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দফা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যেতে থাকে। যুদ্ধ পরবর্তীকালে যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করা হয়েছিল, সেটি ১৯৭৬ সালে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে প্রকাশ্য রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও শক্তিশালী অবস্থান জানান দিতে থাকে দলটি।
কিন্তু পুরো সময়জুড়েই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সঙ্গে দলীয় ও সাংগঠনিকভাবে ‘সংঘাত’ চলমান ছিল। ১৯৯১ সালের পর আবারও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে রাজপথ সক্রিয় হয়ে ওঠে। খালেদা জিয়ার শাসনামলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দল আন্দোলন গড়ে তুললে তাতেও পৃথকভাবে শামিল হয় জামায়াত। বিতর্কিত একটি নির্বাচনের পর ১৯৯৬ সালেই আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দলটি মাত্র তিনটি আসনে জয় পেতে সক্ষম হয়।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোট হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল জয় পেলে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায় জামায়াত। দলটির তখনকার দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রিত্ব পান। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শীর্ষ নেতাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলেই বেশ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
সেই দলটি এবার বাংলাদেশের মানুষের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিরোধীদল গঠন করতে চলেছে। ‘এটা বড় ধরনের ঘণ্টাধ্বনি’ উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘‘এই উত্থান একদিনে হয়নি। আমরা কোথায় ভুল করেছি, সমাজ গড়ে তুলতে হলে—যে কাজগুলো করা দরকার, সেগুলো ঠিক করে করেছি কিনা, সেই প্রশ্নগুলো নিজেদের করতে হবে। এখন আমি অনেক কিছু করণীয় দেখছি। আমাদের নিজেদের দায়িত্ববান হওয়া, নতুন প্রজন্মকে কীভাবে ইতিহাসের সঙ্গে অর্থপূর্ণভাবে যুক্ত করতে পারবো—সেটা নিয়ে কাজ করার কোনও বিকল্প নেই। সবাই মিলে যার যেখানে যে কাজ, তা করার জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের উত্থানটা জরুরি, সেটা যেন আমরা হেলা না করি।’’
বারবার নিষিদ্ধ হয়ে এবার সংসদে
জামায়াতে ইসলামী দলটিকে তার দীর্ঘ চলার পথে বারবার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে হয়েছে। দলটিকে সর্বশেষ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই, আওয়ামী সরকারের পতনের কয়েক দিন আগে। তবে সেবার ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে তার রাজনীতি দ্বিতীয়বারের মতো নিষিদ্ধ হওয়া। তার আগে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পর সরকার যখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিল, তখনও জামায়াতকে কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছিল।
এর আগে ১৯৫৮ সালে অন্য সব দলের সঙ্গে জামায়াতের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেন তখনকার সেনা শাসক আইয়ুব খান। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে জামায়াতকে আবার নিষিদ্ধ করা হয়। একই বছরের শেষ দিকে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এরপর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এই দলটির নেতৃত্বেই রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী গঠিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার অভিযোগ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে রাষ্ট্র অনুমোদন দেওয়া না দেওয়া নিয়ে বারবার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া দলটির এবার প্রধান বিরোধীদল হয়ে সংসদে যাওয়া প্রসঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম ‘দুর্ভাগ্যজনক’ উল্লেখ করে বলেন, ‘‘আমরা এই আশঙ্কা করছিলাম। যারা রাজনৈতিক বন্ধুরা ছিল, আশঙ্কার কথা—তাদের বারবার বলেছি। সচেতন রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীল বিরোধীদল তৈরি করা না গেলে দেশ বড় সমস্যার দিকে যাবে, এটা এখন দৃশ্যমান।’’
তিনি মনে করেন, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪-কে ধারণ করে—এমন রাজনৈতিক শক্তির জোট তৈরি করা না গেলে, এই মুহূর্তে দেশ হয়তো রক্ষা পেলো, তবে ভবিষ্যৎ খারাপ।’’
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের পর থেকে নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং বিপুল সংখ্যক নারী সংসদ সদস্য দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এবারই প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা যেমন নারী নয়, তেমনই সংসদ সদস্য সংখ্যাও মাত্র সাত জন। এত কম সংখ্যক নারী সংসদ সদস্যের উপস্থিতি নিয়ে সমালোচনাও আছে প্রবল। পরিস্থিতির মূল্যায়ন জানতে চাইলে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরিন হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে যখন বিতর্ক হলো, তখনই আমি বলেছি—আমরা তিন পা এগিয়ে, চার পা পিছালাম। নির্বাচনেও তা-ই ঘটলো। তবে হাল ছাড়লে হবে না, হাল ধরে রাখতে হবে, আমাদের যেটা পথরেখা—সেটা ধরে এগোতে হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘অন্যরা কী করলো, সেটা নিয়ে মাথা ব্যথা করলে চলবে না।’’
‘সংরক্ষিত আসনে যারা আসবে, তাদের সঙ্গে সংযোগ রাখতে হবে’, উল্লেখ করে এই নারী নেত্রী বলেন, ‘‘তাদের সবাই নারী অধিকারের পক্ষে হবে তা নয়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে—যাতে নারীর পক্ষে কিছু কথা সংসদে হয়।’’ তিনি বলেন, ‘‘নতুন সরকার গঠন হওয়ার পরে তারা কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে তাদের (নারী এমপি) সঙ্গে আলোচনায় বসার চেষ্টা করবেন।’’