কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ প্রশ্নে বিপুল বিজয়ী বিএনপি’র ক্রম: সহানুভূতি স্পষ্ট হচ্ছে। খুলনা মহানগরীর লোয়ার যশোর রোডের শঙ্খ মার্কেট এলাকায় অবস্থিত আওয়ামী লীগ কার্যালয় খুলে দেয়া হয়েছে। সেখানে দলীয় নেতা-কর্মীরা সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি টানিয়েছেন। তাদের ছবিতে মালা পরিয়ে দেয়া হয়েছে।
এর আগে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ‘ভূমিধস বিজয়’-এর পরদিন পঞ্চগড় আওয়ামী লীগের স্থানীয় অফিসের তালা খুলে দেন স্থানীয় বিএনপি নেতা আবু দাউদ। পরে অবশ্য তিনি দাবি করেন, এটি ছিল একটি গুদামঘর। ধারণা করা হচ্ছে, সারাদেশে কার্যক্রম বন্ধ থাকা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কার্যালয়গুলোও নেতা-কর্মীতে মুখরিত হয়ে উঠবে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি হতে পারে নির্বাচনের পূর্বে স্থানীয় আওয়ামী নেতা-কর্মীদের দেয়া বিএনপির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। অন্য অর্থে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে যে রাজনৈতিক সম্প্রীতির বার্তা দেয়া হয়েছে, সেটিরই হয়তো সুযোগ নেবে আ’লীগ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এমন উদারনীতি রাজনৈতিক দর্শনের সুযোগে এ দেশে আওয়ামী লীগ পুনর্জীবন লাভ করে। বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে যে আ’লীগের বিলুপ্তি ঘটিয়েছিলেন শেখ মুজিব স্বয়ং, সেটি পুনর্জীবন ফিরে পায়। দল হিসেবে বিএনপির এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি দেশ পরিচালনা করবেÑ এমন নিশ্চয়তায় দেশে আত্মগোপনে থাকা এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ, ব্যবসায়ী অলিগার্কদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নাগরিক মনে স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার যে দুর্নীতির পর্বত রচনা করে গেছে, ব্যবসায়ী নামধারী অলিগার্কদের মাধ্যমে যে ঋণের নামে ব্যাংক লুট করেছে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার টাকা পাচার করেছেÑ সেগুলোর কী হবে? এসবের কী কোনো বিচার হবে না? নাকি বিশেষ ধরনের ‘বোঝাপড়া’য় থেমে যাবে অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া? অদৃশ্য ইশারায় ধামাচাপা পড়ে যাবে মেগা দুর্নীতির সব নথি?
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ গ্রহণের পূর্বমুহূর্তে গতকাল সোমবার এমন প্রশ্ন করা হয় দুর্নীতিবিরোধী একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’র কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তাকে। কোনো জবাব দেননি তারা। তবে এটি নির্বাচনের আগে থেকে একটি বিষয় বোঝা যাচ্ছিল যে, হাসিনা সরকার আমলের মেগা দুর্নীতির অনুসন্ধান-তদন্তে ভাটা পড়েছে। মেগা দুর্নীতির ফাইলগুলো কম গুরুত্ব দিয়ে সংস্থাটি ব্যস্ত হয়ে পড়ে ‘প্যাটি করাপশন’ নিয়ে। ব্যক্তি পর্যায়ের ‘অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান’ ‘মানিলন্ডারিং’ ‘অর্থ আত্মসাৎ’ নিয়ে সৃষ্টি করেছে অগণিত নথি। মেগা দুর্নীতিগুলোর ফাইল সৃষ্টি করলেও গতি অত্যন্ত শ্লথ।
শেখ হাসিনা উৎখাত হয়ে ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর একটি ‘শ্বেতপত্র কমিটি’ গঠিত হয়। এ কমিটি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শ্বেতপত্রে উল্লেখিত শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য এবং ব্যবসায়ী নামধারী ব্যাংক লুটেরা, অলিগার্কদের দুর্নীতির তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ৯টি মেগা প্রকল্প থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং বেজা ও বেপজার বিভিন্ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল অর্থ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ খেলাপির অঙ্ক দাঁড়ায় ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। এস আলম, সামিট, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপের মতো প্রভাবশালী অলিগার্করা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেনামি ঋণ ও জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেয়।
শ্বেতপত্রে হাসিনা আমলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে আন্ডার ইনভয়েস-ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়েছে। হাসিনার দেড় দশকের পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ২শ’ বিলিয়ন ডলারের বেশি। প্রকাশিত শ্বেতপত্রের তথ্য মতে, হাসিনার দেড় দশকে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে।
পূর্বাচল নিউ টাউন প্রকল্পে সরকারি জমি অবৈধভাবে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বরাদ্দ নেয়ার দায়ে আদালত শেখ হাসিনা, পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবশ্য বিভিন মেয়াদে কারাদ- হয়েছে। তবে এ মামলা উচ্চ আদালতে টিকবে কি নাÑ এমন সংশয় প্রকাশ করেছেন আইনজ্ঞরা।
পদ্মা সেতু এবং ঢাকা মেট্রো রেলের মতো বড় প্রকল্পগুলোতেও ব্যয় বৃদ্ধি এবং কিকব্যাক বা কমিশন গ্রহণের তথ্য রয়েছে শ্বেতপত্রে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি আইন ব্যবহার করে দেশের বিপুল সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে। সেটি নিয়ে কোনো অনুসন্ধানই শুরু হয়নি। শ্বেতপত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাসিনা আমলে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে ব্যাংকিং, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং তথ্য-প্রযুক্তি খাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত নিয়ে চলছে লুকোচুরি। সরকারি অর্থ চুরি হয়েছে। সরকারি লোক চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। রিজার্ভ চুরির মামলা তদন্তের শতভাগ এখতিয়ার দুদকের। তা সত্ত্বেও এটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে পুলিশের সিআইডিকে দিয়ে তদন্ত করানো হচ্ছে। সিআইডি চার্জশিট দাখিল করলে আদালত হয়তো সেটি গ্রহণ না করে পুনঃতদন্তের জন্য তফসিলভুক্ত সংস্থা হিসেবে দুদকেই পাঠিয়ে দেবেন। মাঝখানে কালক্ষেপণ হলো। অপরাধীরা এক ধরণের সুবিধাও পেলেন।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ‘চামচাতন্ত্র’ ও ‘চোরতন্ত্র’ সৃষ্টি হয়েছিল। এতে রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বিচার বিভাগসহ সবাই অংশ নিয়েছে। প্রায় ২৮ পদ্ধতিতে সংঘটিত হয়েছে দুর্নীতি। এসব দুর্নীতির অধিকাংশেরই কোনো তল খোঁজার চেষ্টা করছে না দুদক।
হাসিনার দুর্নীতি, মাফিয়াতন্ত্রের বিপরীতেই সংঘটিত হয় চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান। অভ্যুত্থানের ১৭ মাসের মাথায় বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিচ্ছে বিএনপি। সচেতন নাগরিক সমাজের সহজ প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের প্রতি ক্রম: সহানুভূতি দেখিয়ে নতুন সরকার আ’লীগের এই লুটতন্ত্রের তদন্ত ও বিচার করবে তো? নাকি ‘উদারনৈতিক পলিসি’র আওতায় এসব দুর্নীতির দায় থেকে কারাবন্দি ও পলাতক আওয়ামী অলিগার্করা বিশেষ বোঝাপড়ায় দায়মুক্তি দিয়ে দেবে?