Image description

বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আর মাত্র কয়েক দিন পরই। একই দিনে হবে জুলাই সনদ ইস্যুতে গণভোট। শেষ মুহূর্তে এসে এই দুই ভোটের ফল নিয়ে দুশ্চিন্তায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা, পাশাপাশি নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তারাও রয়েছেন নিজেদের পেশাগত ভাবমূর্তিতে কোনো দাগ না লাগিয়ে বিতর্কমুক্তভাবে সবকিছু সম্পন্নের প্রচেষ্টায়। যদিও ভোট কারচুপির অভিযোগ এবারের নির্বাচনেও পিছু ছাড়বে না—এমন আশঙ্কা তাড়া করে ফিরছে তাদের।

এ ছাড়া কখন কোন অভিযোগে বদলি কিংবা ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হতে হয়, রয়েছে এমন ভয়ও। সবমিলিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দিনভর ভোটগ্রহণ এবং তারপর ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তাদের মধ্যে ভর করা অজানা শঙ্কা কাটছে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মাঠ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমনই চিত্র।

সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট গ্রহণ সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অধীনে পাতানো তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০১৪ সালের ভোটে দায়িত্ব পালনকারী অনেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং পুলিশ সুপারকে (এসপি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ২০১৮ সালের ভোটে দায়িত্বপালনকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ডিসিদের ওএসডি করা হয়। তারা কর্মজীবনে আদৌ ফিরতে পারবেন কি না, সেটি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। এসব কর্মকর্তার পদোন্নতিও মেলেনি। কেউ কেউ বলছেন, ২০১৮-এর নির্বাচন পরিচালনাকারী ডিসিদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেবে সরকার। এসব কর্মকর্তাকে শাস্তির আওতায় আনার ফলে এবারের নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা অনেক বেশি সতর্ক। তারা দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করা থেকে এখন পর্যন্ত বিরত রয়েছেন। যদিও মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের ধাপে অনেক ডিসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছিল। তখন সরকারের তরফ থেকে তাদের সতর্ক করা হয়। ফলে তারা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করছেন। তবে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে কর্মকর্তারা ফেঁসে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তাদের মধ্যে এক ধরনের দুশ্চিন্তা কাজ করছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকার জন্য আমাদের বারবার বলা হচ্ছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও বারবার এ ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। বারবার সরকারের তরফ থেকে নির্দেশনা দেওয়ার ফলে তাদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ, ভোটে অনিয়ম হলে তাদের দায় নিতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকার পাশের একটি বড় জেলার ডিসি কালবেলাকে বলেন, ‘ভোটে নানা হিসাব-নিকাশ আছে। প্রার্থীরা সবাই চান আমরা যেন তাদের পক্ষে থাকি। এটা তো সম্ভব নয়। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে। ফলে ভোটের ফল যাদের বিপক্ষে যাবে, তারা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবে। এটা পুরোনো সংস্কৃতি। এজন্য বাড়তি দুশ্চিন্তা আছে।’

 
 

রিটানিং কর্মকর্তা হিসেবে কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছেন। আবার কর্মকর্তাদের নামে তারা অভিযোগ দিচ্ছেন। ফলে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের ভয়ে কাবু অনেক কর্মকর্তা।’

 

এবারের ভোট বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে এই ডিসি আরও বলেন, ‘এজন্য বাড়তি টেনশন (দুশ্চিন্তা) কাজ করছে। তবে গাড়ি যেহেতু চালাতে নেমেছি, এত কিছু ভেবে লাভ নেই। দুর্ঘটনার ভয় পেলে চলবে না। আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতেই হবে।’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ডিসি-ইউএনওরা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখন নির্বাচন ছাড়া অন্য কাজ তেমন একটা নেই। তারা ভোটকেন্দ্রিক ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে এবার ব্যাপক প্রতিযোগিতা ও ভোটের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেশি থাকায় সুষ্ঠুভাবে ভোটের কার্যক্রম শেষ করা পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তা চিন্তিত।

ডিসি-এসপিদের ওপর চাপ বেশি: ভোটের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকেন। অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর দায় নিতে হয়েছে তৎকালীন ডিসিদের। ফলে এবারের নির্বাচন ডিসিদের জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। আর পুলিশের নিয়ন্ত্রক হিসেবে জেলার এসপির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তারাও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হওয়া-না হওয়ার পেছনে দায়ী থাকেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ অধিদপ্তর থেকে পুলিশকে বারবার এ বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এতে বাড়তি সতর্কতার পাশাপাশি বাড়তি চাপেও রয়েছে পুলিশ।

একজন ডিসি কালবেলাকে বলেন, ‘আমি জীবনে কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। কিন্তু এখন ভোটের দায়িত্ব পালন করতে আমাকে রাজনৈতিক কর্মী তকমা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। শুধু আমি নই, অন্য কর্মকর্তাদেরও জামায়াত-বিএনপি কিংবা অন্য দলের আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এটা আমাদের ক্যারিয়ারের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য রাজনৈতিক তকমা পাওয়ার ভয়েও আছেন অনেক কর্মকর্তা।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশন, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, কোস্টগার্ডসহ বিচারিক ও ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ সব স্তরের বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে পারস্পরিক সুসম্পর্ক, সমন্বয়, তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ টহলসহ সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গ্যাপ, বিচ্যুতি, ত্রুটি, বৈষম্য, অবহেলা, দ্বন্দ্ব বরদাশত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের ভাষ্য, ‘আমরা ছেলেবেলায় পড়েছি, জেলা প্রশাসকরা হলো সরকারের চোখ, হাত ও মুখ। এই ডিসিদের চোখ দিয়ে সরকার দেখে, মুখ দিয়ে সরকার বলে ও হাত দিয়ে সরকার কাজ করে। কিন্তু এই চোখ, মুখ ও হাত আজ নষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং মাঠপর্যায়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করতে হবে। কোনো ব্লেমিং গেম শোনা হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, জেলা প্রশাসকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পুরো প্রসেসে (প্রক্রিয়া) আইনের প্রয়োগ থেকে শুরু হয়ে সবকিছুতে তাদের সম্পৃক্ততা থাকে। আমরা তাদের বলেছি, এই যে সামনে নির্বাচনটা আসছে, নিজ উদ্যোগে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করবেন। আমরা নির্বাচন কমিশন থেকে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করব। আপনাদের যে ক্ষমতা আইন দিয়েছে এর সর্বোচ্চ প্রয়োগ করবেন।’

ডিসিদের প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, ‘আমাদের ডিসিরা কিছু অসুবিধার কথা বলেছেন। পার্টিকুলারলি স্টোরেজ প্রবলেমের কথা বলেছেন। আর এনআইডি নিয়ে মানুষের হয়রানির কিছু কথা বলেছেন। আমরা এটা ক্লারিফাই করেছি। আমরা এগুলো অ্যাড্রেস করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছি।’

পুলিশের আইজিপি বাহরুল আলম বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধের প্রমাণ রাখবে। বাংলাদেশ পুলিশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বাহিনীর সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে নিরলস কাজ করা হচ্ছে।’

রোষানলে ইউএনওরা: গত ১৭ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার নির্বাচনী এলাকার ইউএনওকে আক্রমণাত্মকভাবে বারবার বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ও আঙুল উঁচিয়ে বিভিন্নরকম হুমকি-ধমকি দেন। তিনি বলতে থাকেন, ‘দিজ ইজ দ্যা লাস্ট টাইম আই ওয়ার্নিং ইউ, আই উইল নট লিসেন টু দিজ। আপনি পারলে থামাই দেন, আজ ভদ্রতা দেখাচ্ছি, নেক্সট টাইম কিন্তু এই ভদ্রতা করব না। আপনাদের এরকম দেখায় (আক্রমণাত্মকভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান), খোঁজ নেন, প্রশাসনে বইসা আছেন খোঁজ নেন।’ পরে অবশ্য রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। দেশের অন্যান্য এলাকায়ও স্থানীয় কর্মকর্তা, বিশেষ করে ইউএনও ও এসিল্যান্ডদের ওপর নানা অভিযোগ চাপিয়ে দিচ্ছেন প্রার্থীরা। গত কয়েকদিন আগে দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলার ইউএনওকে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে আবার সেই বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। প্রার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদের বদলি করা হয়েছিল। পরে আবার অন্য প্রার্থীদের অনুরোধে ওই আট ইউএনওর বদলি আদেশ স্থগিত করা হয় বলে জানা গেছে। এ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও দুই ভাগে বিভক্ত হন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

শুধু ইসিতে নয়, সাংবাদিকদের কাছে কর্মকর্তাদের নামে অভিযোগ দিচ্ছেন প্রার্থীরা। এই প্রতিবেদকের কাছে অনেক কর্মকর্তার নামে অভিযোগ এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের অনুরোধও করেছেন কোনো কোনো প্রার্থী।

একাধিক ইউএনও কালবেলাকে জানান, প্রার্থীরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের কাছে অভিযোগ দিচ্ছেন। এসব অভিযোগ সমাধান করতে হচ্ছে। আসলে ভোটের মাঠে কাউকে সন্তুষ্ট রাখা খুবই কঠিন কাজ। সন্তুষ্ট না হলে তাদের কেউ কেউ নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিচ্ছেন। এটা কর্মকর্তাদের জন্য চিন্তার কারণ।

তারা আরও বলেন, প্রভাবশালী প্রার্থীদের নেতাকর্মীদের তোপের মুখেও অনেক সময় পড়তে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা আইন অনুযায়ী সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী কালবেলাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ জন ইউএনও-এসিল্যান্ডের নামে অভিযোগ এসেছে। ইসি থেকে আমাদের কাছে এসেছে। আমরা এগুলো বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে তদন্ত করে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেব।’

কর্মকর্তাদের অভয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢালাও কেউ অভিযোগ দিলেই কোনো অফিসারকে বদলি কিংবা ওএসডি করার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত কারও তদবিরে অন্যায়ভাবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে না। এবারের ভোট যেন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে আমরা সেই পথে হাঁটছি। সুতরাং কর্মকর্তারা চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই বলেও মনে করেন আশরাফ রেজা ফরিদী।’