ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণার কাজে পরিবেশবান্ধব বনকাগজের ব্যবহার বেড়েছে। নির্বাচনি প্রচারণায় বনকাগজে তৈরি লিফলেট, প্রচার কার্ড, ফেস্টুন ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। বনকাগজের লিফলেট পচনশীল এবং মাটিতে ফেললে গজিয়ে উঠছে বিভিন্ন সবজির চারা। কারণ, তৈরির সময় এই কাগজের সঙ্গে বিভিন্ন সবজির বীজ সুনিপুণভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে বনকাগজের তৈরি লিফলেট বা ব্যানার দেখতে অন্য কাগজের তুলনায় সুন্দর হওয়ায় ভোটারদের দৃষ্টি কাড়ছেন প্রার্থীরা।
বিএনপি প্রচার-প্রচারণার কাজে ‘বনকাগজ’ ব্যবহার করছে। বিশেষ করে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনি প্রচারের জন্য বনকাগজের তৈরি পরিবেশবান্ধব প্রচার কার্ড ও লিফলেটের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে অর্ডার করা হয়। তারেক রহমানের নির্বাচনি এলাকা বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসনে বনকাগজের তৈরি লিফলেট ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন বনকাগজের প্রচার কার্ডের জন্য।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় নারায়ণগঞ্জের কায়েমপুর বটতলা এলাকায় অবস্থিত শালবৃক্ষের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বনকাগজের কর্ণধার মাহবুব সুমনের সঙ্গে। গত এক মাসে প্রায় সারা দেশে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপিসহ ৩২ জন প্রার্থী বনকাগজের তৈরি প্রচার কার্ডের অর্ডার করেছেন। খুব যত্নসহকারে হাতে তৈরি করতে হয় বনকাগজের প্রতিটি শিট। পরিত্যক্ত কাগজ থেকে মণ্ড তৈরি করে চারটি লেয়ারে কারুকাজ করে কোনো প্রকার কেমিক্যাল ছাড়া তৈরি করা হয় বনকাগজের শিট। এই শিট তৈরির সময় ভেতরে দিয়ে দেওয়া হয় টমেটো, কাঁচা মরিচ, লালশাক, পালংশাক, বেগুনসহ বিভিন্ন প্রকার সবজির বীজ। নিখুঁতভাবে এসব বনকাগজ তৈরি হওয়ায় প্রতিটি শিট থেকেই চারা জন্মায়। কিন্তু ছোট পরিসরের কারখানা হওয়ায় এবং একসঙ্গে অনেক অর্ডার পড়ায় দম ফেলার সুযোগ পাচ্ছেন না বনকাগজের কর্মীরা।
বনকাগজ তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মী টিটু বলেন, বনকাগজ তৈরি করতে হয় সময় নিয়ে। আমরা ভালোবেসে কাজটি করছি। প্রতিটি কাজ নিখুঁতভাবে করা হয় বলে প্রতিটি শিট থেকেই সবজির চারা গজায়। আরেক কর্মী বলেন, তিন বছর ধরে বনকাগজ উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত আছি। কাজটি ব্যতিক্রমী ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এই কাজের সঙ্গে মায়ায় জড়িয়ে গেছি।
বনকাগজ তৈরির প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মাহাবুব সুমন বলেন, ছয় বছর আগে যাত্রা শুরু হয় বনকাগজের। ধীরে ধীরে এটি সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে প্রচার পায়। তবে ২০২১ সালে সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে একজন প্রার্থী তার নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যবহার করেন বনকাগজের তৈরি প্রচার কার্ড। প্রেসে ছাপানো নরমাল লিফলেটের তুলনায় বনকাগজের প্রচার কার্ড দেখতে আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী হওয়ায় ভোটারদের কাছে বেশ পরিচিতি পায় এটি। ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন ওই প্রার্থী। আর এতে ব্যাপক প্রচারণা পায় বনকাগজ। এবারের নির্বাচনে আগে বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়।
বলা হয়, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার নির্বাচনি প্রচারণায় বনকাগজের তৈরি প্রচার কার্ড ব্যবহার করবেন। সেই আলোকে অর্ডার দিলে তিনি প্রচারকার্ড বানিয়ে সরবরাহ করেন। এটি নির্বাচনি এলাকার মানুষের হাতে পৌঁছালে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা অর্ডার করেন। তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব ও হাতে তৈরি একটি শিট থেকে বড় আকারের চারটি ও ছোট আকারের ৯টি প্রচার কার্ড তৈরি করা যায়। এটি করতে বেশ খরচ হয়। কিন্তু সরকার নীতিগত সহায়তা দিয়ে এবং ব্যাংক সেক্টর সহজ শর্তে, স্বল্প সুদে ঋণ দিলে কম খরচে পরিবেশবান্ধব বনকাগজ তৈরি এবং বাণিজ্যিকভাবে প্রসার ঘটানো সম্ভব। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে। মাটিতে ফেললে সবজির চারা হবে। মানুষ সেই সবজি খেতে পারবে।