মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই না দিয়ে কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। এ কারণে এখনো সব বই পায়নি শিক্ষার্থীরা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কাগজে-কলমে সব পাঠ্যবই সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বই না পেয়ে হতাশ শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষার্থী বই না পাওয়ায় তাদের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে তাদের পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একাধিক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান এনসিটিবিতে বই না দিয়েই সনদ দাখিল করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা বড় রকমের জালিয়াতি হিসাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে জালিয়াতি ধরা পড়ার পর গোপনে বই ছাপানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অভিযুক্ত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন উপজেলায় সরবরাহ করা অতিরিক্ত বই অল্প দামে সংগ্রহ করে পুনরায় বিতরণ করছে বলে জানা গেছে। এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক, ইন্সপেকশন এজেন্ট ও মনিটরিং কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো অনিয়ম করেছে। এ বিষয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন এনসিটিবি সচিব। এনসিটিবির সূত্র বলছে, পাঁচটির বেশি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বই ছাপানোর কাজ শেষ না করে ভুয়া সরবরাহ (ডেলিভারি) সনদ দাখিল করেছে। এদের বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। অ্যারিস্টোক্রেট প্রেস নামে একটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান এখনো শিক্ষার্থীদের বই ছাপানোর কাজ করছে। অভিযুক্ত প্রেসগুলোর বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বিনামূল্যের বই ছাপানোয় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল।
এনসিটিবির সচিব অধ্যাপক সাহতাব উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, এবার বই ছাপানোর সব কার্যক্রম আমরা কঠোরভাবে মনিটরিং করছি। এতে অনেক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বই না ছাপিয়ে ডেলিভারির নথিপত্র উপস্থাপন করেছে। যা বড় অনিয়ম। দ্রুত এসব বই ছাপিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর কাজ চলছে। অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে- জানান তিনি।
জানা যায়, চলতি শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বই ছাপানোর কাজ পেয়েছে প্রায় একশ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে পাঁচটির বেশি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বই না ছাপিয়ে এনসিটিবিতে বই সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে মর্মে সনদ দাখিল করে।
এই তালিকায় মহানগর অফসেট প্রেসের ৭ লাখ বই ও বর্ণমালা প্রেসের ৫ লাখ বই রয়েছে। এছাড়া রাব্বিল প্রেস ও আমাজন প্রিন্টিং প্রেসের রয়েছে কয়েক লাখ বই। এসব প্রেস মালিকরা এনসিটিবির কর্মকর্তা ও ইন্সপেকশন এজেন্টকে ম্যানেজ করে কাগজে-কলমে শতভাগ বিতরণ সনদ দাখিল করেন। এর ফলে প্রকৃত বই বিতরণের চিত্র আড়াল থেকে যায়। এদের মধ্যে কোনো কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষা অফিস ও বিদ্যালয় থেকে ‘অতিরিক্ত’ বই অল্প দামে সংগ্রহ করে সেগুলো আবার নিজেদের ঘাটতি পূরণে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ একদিকে বই ছাপানো শেষ না করেই সরবরাহ দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে অন্য জায়গা থেকে সংগ্রহ করা বই দিয়ে কাগজে-কলমে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেছে। মাঠপর্যায়ে বিতরণ যাচাই না করেই সরবরাহ সনদ দিয়েছে এনসিটিবির ইন্সপেকশন টিম। তা গ্রহণ করেছে এনসিটিবির বিতরণ শাখা। এতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই অনিয়ম করার সুযোগ পেয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান যুগান্তরকে বলেন, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি সত্য নয়।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, বই ছাপা ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা হলে প্রতি বছরই এ ধরনের সংকট তৈরি হবে। দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর বই বিতরণে এমন অনিয়ম শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা বলেন, বই ছাপা ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমবে না।
এনসিটিবির সূত্র জানায়, চলতি শিক্ষাবর্ষে বিনামূল্যের বিতরণের জন্য প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই প্রায় ৮ কোটি ৪৯ লাখ ২৫ হাজার এবং মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ২১ কোটি ৪০ লাখ বই ছাপার কাজ শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে নবম শ্রেণির মোট পাঠ্যবই ৫ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ২৮ কপি। এবার মাধ্যমিকে পুনরায় তিন শ্রেণির দরপত্র আহ্বান করা হয়। তার মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ের সংখ্যা ৪ কোটি ৪৩ লাখ ২১ হাজার ৯০৬, সপ্তম শ্রেণির ৪ কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬৯২ এবং অষ্টম শ্রেণির ৪ কোটি ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৮। দরপত্র বাতিল হওয়া তিন শ্রেণির মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল গত ১৯ মে, সপ্তম শ্রেণির ১৫ মে এবং অষ্টম শ্রেণির ২ জুন। গত বছর ৪ ডিসেম্বর বই ছাপানোর চুক্তি শেষ হয়।