Image description
ক্ষুব্ধ সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা

‘ভোটের মাঠে টাকা ওড়ে’-বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটি এখনো সত্য বলে আমাদের সমাজে স্বীকৃত। জাতীয় সংসদ নির্বাচন, কী স্থানীয় সরকার নির্বাচন; নির্বাচন মানেই চলে টাকার খেলা। ভোট করতে টাকা লাগবেই। দল ও ব্যক্তির জনপ্রিয়তা, এমনকি সাংগঠনিক ভিত থাকলেও ভোটে জয়ী হতে টাকার একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে। এক সময় বলা হতো দশটা হোন্ডা-বিশটা গুন্ডার নির্বাচন। কথাটি গ্রামের ভাষা হিসাবে বলা হলেও শহুরে মানুষ নাম দিয়েছে-‘মানি-মাসলম্যানের নির্বাচন।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে এসব আলোচনা-সমালোচনার বাইরে ভোটের মাঠে সব সময় টাকার খেলাটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য। আমাদের নির্বাচনি সংস্কৃতি এখনো এসব দুর্বৃত্তায়নের ঘেরাটোপ থেকে সেভাবে বের হতে পারেনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই টাকা যেসব সাধারণ ভোটারদের বশে আনতে খরচ করা হয়, তারা কি শেষ পর্যন্ত তা চোখে দেখে। উত্তরটা খুবই সহজ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ ভোটারদের হাতে এই টাকা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোনোভাবেই পৌঁছায় না। মাঝখানে প্রায় সবটাই খেয়ে ফেলে বা আত্মসাৎ করেন প্রার্থীর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকা একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী। যারা প্রার্থীর বিশ্বস্ত নির্বাচনি এজেন্ট, বড় ভাই ও কিংবা প্রভাবশালী ক্যাডারসহ নানা নামে পরিচিত। গত দশ দিনে নির্বাচনি প্রচারণায় মাঠের বাস্তব চিত্র এমনটিই বলছে। নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্র এবং নির্বাচনি আসন থেকে যুগান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে এমন অভিযোগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার অতীতের মতো এবারও জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা টাকার মাধ্যমে ভোট কেনার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে টাকার খেলা চলছে। অথচ নির্বাচনি ব্যয় কমাতে অনিয়ম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার জন্য এক বা একাধিক আসনের জন্য নির্বাচনি ব্যয় মনিটরিং কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু তা আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে অতীতের ব্যবস্থাই যেন বহাল রয়েছে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, বড় দলের প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য প্রার্থীরা যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে জয়ী হতে চান। এজন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করছেন। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসবে, এই খরচের পরিমাণ তত বাড়বে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, এই টাকার বেশির ভাগই মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যায়। সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের ভাগ্যে কিছু জোটে না।

রাজধানী ঢাকার একাধিক আসনে সরেজমিন ঘুরে পাওয়া গেছে এমন চিত্র। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় খবর নিয়েও মিলেছে একই তথ্য। ঢাকার একটি সংসদীয় এলাকার দুই বড় দলের দুজন প্রভাবশালী প্র্রার্থী ছাড়াও আরও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটযুদ্ধে নেমেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ত্রিমুখী লড়াই হবে এই আসনে। তিন প্রার্থীই ভোটারদের মন জয় করতে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। উঠান বৈঠক ও জনসংযোগ করছেন। যেখানে যা দরকার, সে অনুযায়ী অর্থও খরচ করছেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তাদের আশপাশে থাকা পাতি এবং ভুঁইফোঁড় নেতারা এসব টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিজেদের পকেটে ভরছেন। তাই মাঠপর্যায়ে কর্মীর কাছে টাকা পৌঁছায় না। এমনকি সাধারণ কর্মী-সমর্থকসহ যারা পছন্দের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন, তারা দিনশেষে বাড়ি ফিরছেন শূন্য হাতে।

দক্ষিণাঞ্চলের একটি নির্বাচনি এলাকায় বড় দলের হয়ে এবার প্রার্থী হয়েছেন লন্ডন প্রবাসী একজন রাজনীতিবিদ। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। এই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন একই দলের আরেকজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। এখানে আরেকটি বড় দলের যিনি প্রার্থী, তিনিও আর্থিক অবস্থার দিক থেকে বেশ প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য। ভোটে জয়ী হতে এই তিন প্রার্থীই দেদার টাকা বিলাচ্ছেন। তিনজনই তাদের নির্বাচনি এলাকায় প্রায় দুই হাজার প্রচার কেন্দ্র করেছেন। প্রতিটি কেন্দ্রে খরচ বাবদ প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে দিচ্ছেন তিন প্রার্থীই। এর বাইরে হাতখরচ, যাতায়াত খরচসহ আরও অন্যান্য খরচ মেটাচ্ছেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, এসব টাকার বেশির ভাগই তাদের পছন্দের, দলের এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সিন্ডিকেট করে নিজেদের পকেটে ঢুকাচ্ছেন। এলাকায় যাদের অনেকে দালাল বা ফড়িয়া হিসাবে পরিচিত। দলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা এদের কাছে অনেকটা অসহায়।

জানতে চাইলে ওই নির্বাচনি এলাকার এক প্রভাবশালী প্রার্থী নাম না প্রকাশের শর্তে যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন মানেই খরচ। এই খরচের কোনো সীমারেখা নেই। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে খরচ আরও বাড়বে। তিনি আরও বলেন, আমরা যে টাকা খরচ করি তা যে সাধারণ ভোটারদের কাছে পৌঁছায় না, এটা আমরাও জানি। আমাদের আশপাশে থাকা লোকজনই বেশির ভাগ টাকা খেয়ে ফেলে। এসব জেনেও চুপ থাকি। অবস্থাদৃষ্টে কিছুই করার নেই।

এই আসনেরই আরেক প্রভাবশালী প্রার্থী যুগান্তরকে বলেন, কে কী করে তা বলতে পারব না। তবে আমাদের কর্মীরাই উলটো তাদের পকেটের টাকা দলীয় প্রার্থীর ও দলের জন্য খরচ করে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন তো আমাদের কাছে একটি আদর্শিক যুদ্ধ। জয়-পরাজয় যাই হোক, আমাদের কর্মীরা সব অবস্থায় পাশে থাকে। ফলে আমাদের নির্বাচনি প্রচারণার ব্যয় মধ্যস্বত্বভোগীরা খেয়ে ফেলার সুযোগ নেই।

তবে ওই নির্বাচনি এলাকার সাবেক একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, বড় দলের প্রভাবশালী প্রার্থীরা নিজের পকেটের টাকা খরচ করেন না। তারা দল থেকে টাকা পান, বিভিন্ন ব্যবসায়ীসহ সমাজের বিত্তবানদের কাছ থেকে নির্বাচন উপলক্ষ্যে আর্থিক ডোনেশন নেন। সেই টাকাই তারা খরচ করেন। প্রার্থীর আশপাশে থাকা লোকজনও এটা জানে, বোঝে। তাই তারা যে যেভাবে পারে নিজের পকেটই আগে ভরে, নিজের আখের গোছায়। এছাড়া আবার এমন নজিরও আছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একজন প্রভাবশালী প্রার্থী অনুদান হিসাবে যে পরিমাণ টাকা পান তার বেশির ভাগ তিনি খরচ করেন না।

লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রথম থেকেই চেয়ে আসছি নির্বাচনে খরচ কমাতে। সাধারণ মানুষ, মধ্যবিত্ত সবাই যাতে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নির্বাচনে দিন দিন যেভাবে খরচ বাড়ছে বা প্রার্থীরা যেভাবে টাকা খরচ করছেন, তাতে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই ঘুরেফিরে নির্বাচন করবেন। তারাই সংসদে যাবেন। তিনি আরও বলেন, ভোটের সময় প্রার্থীরা যে টাকা খরচ করেন, এই টাকা সাধারণ ভোটার, গরিব ভোটার, সাধারণ কর্মী বা সমর্থকদের হাতে যায় না। এসব টাকা প্রার্থীর আশপাশে থাকা চক্রের সদস্যরাই লুটেপুটে খায়। ফলে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা ক্ষুব্ধ থাকেন। কিন্তু নানা কারণে তারা তা প্রকাশ করতে পারেন না।