Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় ভারতবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা। গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন ও ইশতেহার ঘোষণায় ‘আধিপত্য’, ‘হস্তক্ষেপ’, ‘চুক্তি’ কিংবা ‘ন্যায্য হিস্যা’—এ ধরনের শব্দবন্ধ বারবার উঠে এসেছে।

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অবস্থানের কথা বলতে গিয়েই এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করছেন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রার্থীরা। এভাবে নিজেদের ‘ভারতবিরোধী’ কিংবা ‘আধিপত্যবাদের বিরোধী’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ভোট টানার কৌশল। ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। তাঁদের ভোট টানতেই নিজেদের ভারতবিরোধী হিসেবে দেখানোর প্রবণতা প্রার্থী ও দলগুলোর মধ্যে রয়েছে। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ কিংবা পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কন্নয়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ বা পরিকল্পনা এখনো অনুপস্থিত।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবিরের মতে, দলগুলোর পক্ষ থেকে কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কোনো রোডম্যাপ বা পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে এটি বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি। শুধু মুখের ফাঁকা বুলি কিংবা ভারত বিরোধিতার গথবাঁধা কথা দিয়ে হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলছেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এ জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার ও এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনা থাকতে হবে। এ ছাড়া আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে ‘গ্র্যাজুয়েট’ করবে। এ গ্র্যাজুয়েশনকে সামনে রেখে কাঠামোগত সংস্কার ত্বরান্বিত করা এবং যে সুবিধাগুলো বাংলাদেশ হারাবে, তার বিকল্প খুঁজে বের করা দরকার।

হুমায়ুন কবির স্ট্রিমকে বলেন, ‘কোনো পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছি না। এই জায়গায় চিন্তা যোগ করা দরকার। নতুন সরকার এসে যে কোনো ধরনের সংস্কার যেমন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, ভিসা কার্যক্রম, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—সবকিছুতেই বৈদেশিক যোগাযোগ ও তাদের টেকনিক্যাল সাপোর্ট, আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আমরা শুধু একই ধরনের কিছু কথা শুনছি, এর বাইরে কিছু পাচ্ছি না।’

গত ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে এক জনসভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ‘ক্ষমতায় এলে ১১ দলীয় জোট ভারতের আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার রুখে দেবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ১১ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।’

প্রচারণার শুরুর দিন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কুমিল্লার এক নির্বাচনী সমাবেশে অভিযোগ করে বলেন, ‘বিএনপি ভারতের সঙ্গে “তিন শর্তে চুক্তি” করেছে।’

বক্তব্যটি বিতর্কের জন্ম দেয়। এর দুই দিন পর ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন ওই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘অপপ্রচার’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বলেন, ‘এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই এবং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য।’

তিনি বলেন, ‘শহীদ জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই বিএনপির রাজনৈতিক ঐতিহ্য।’

গত ৩১ জানুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম কুমিল্লার এক সমাবেশে ভারতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী একটি দেশ বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে আসছে। তারা বলেছে ১১ দলীয় জোট ভোট চুরি ছাড়া ক্ষমতায় যেতে পারবে না। গত ১৬ বছর তারা ফ্যাসিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘মাঠের প্রচারে ভারতবিরোধিতার কথা যতটা শোনা যাচ্ছে, একই সময়ে ভারতের কাছ থেকে তিস্তা–পদ্মাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের বাস্তব পরিকল্পনা ততটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে দেখা যাচ্ছে না। দলগুলোর ইশতেহারে বিষয়টি স্পষ্ট করা উচিত।’

কে এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘ভোট টানার কৌশল হিসেবেই প্রচারণার সময় ভারতবিরোধী বা ভারত-সমালোচনামূলক স্লোগান দেখা যাচ্ছে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী প্রবণতা দেখা গেছে। ওই অংশেরই ভোট টানতে এসব বলছে দলগুলো। একইভাবে আওয়ামী লীগের যে সমর্থকগোষ্ঠী আছে তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে আরেক অংশের ভোট টানার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।’

এদিকে, গত ৩০ জানুয়ারি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে এনসিপি। এতে পার্শ্ববর্তী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। দলটি বলেছে, ‘ভারতের সঙ্গে সমতা, পারস্পরিক মর্যাদা ও ন্যায্যতা ভিত্তিতে আমরা একটি সার্বভৌম আন্তরাষ্ট্রীয় কৌশলগত সম্পর্ক চাই। কোনো ধরনের আগ্রাসনবাদী আচরণ, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা একতরফা সুবিধা আদায়ের নীতি গ্রহণযোগ্য নয়।’

এ বিষয়ে সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিকল্পনার ব্যাপারে বহির্বিশ্ব অপেক্ষায় আছে। কিন্তু দলগুলো এ নিয়ে খুবই “জেনারেল” কথাবার্তা বলছে। আলোচনা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ভিত্তিতে, কিন্তু এসব চাহিদা মেটাতেই তো আমাদের বিদেশি সহায়তার দরকার।’

এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘অপ্রিয় হলেও সামনের দিনে আমাদের কিছু অভ্যন্তরীণ সংস্কার করতে হবে। তা নাহলে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে প্রতোযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। এ জন্য দলগুলোকে রোডম্যাপ বা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে হবে। বলিষ্ঠতা বজায় রেখেই আমরা দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারি বা অবস্থান নির্ধারণ করতে পারি।’