Image description
জামায়াতের ইশতেহার কাল

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইশতেহার বা নির্বাচনি মেনুফেস্টো চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। আগামীকাল ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতেহার ঘোষণা করবেন। ‘সর্বাগ্রে বাংলাদেশের স্বার্থ’ এই মূলনীতির আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য দলটি এবার তাদের স্লোগান নির্ধারণ করেছে, ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ।’ এই স্লোগানকে ধারণ করেই ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে দলটির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সূত্রমতে, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, যুবসমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, নৈতিক শিক্ষাসহ শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং বিভিন্ন সেক্টরে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব থাকবে ইশতেহারে। এতে কমপক্ষে ৪০ দফা প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ থাকতে পারে।

স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে দেশের কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রকাঠামোতে ব্যাপক সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে ইশতেহারে। জানা গেছে, জুলাই চেতনাকে ধারণ করে তৈরি হবে ইশতেহার। এতে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে তোলার কঠোর বার্তা দেওয়া হবে। সততা, দেশপ্রেম, দুর্নীতিকে ‘না’ বলার কথা উল্লেখ থাকবে। ‘দুর্নীতি করব না-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব না’ এমন স্লোগান থাকছে ইশতেহারে। বাংলাদেশের প্রধানতম সমস্যা হলো দুর্নীতি। এজন্য জামায়াতের ঘোষণাই হলো দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। ক্ষমতায় গেলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য জামায়াত কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকবে দলটির ইশতেহারে। প্রশাসনের সর্বস্তরে এ ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো হবে বলে উল্লেখ থাকবে। সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে দেশের সব প্রশাসনিক দপ্তর। প্রশাসনিক সেবাগুলো ডিজিটালাইজ করা হবে। থাকবে সব ধরনের তদবির বন্ধ করার অঙ্গীকার। এছাড়া দুর্নীতির মামলাগুলোর দ্রুত বিচার করা হবে। মন্ত্রী, এমপি এবং সব স্তরের জনপ্রতিনিধি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী জনসম্মুখে প্রকাশ করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তরুণদের জন্য ইশতেহারে থাকবে নানা পরিকল্পনার কথা। দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ৫ বছরে ১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক দক্ষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন করা হবে। প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫০ লাখ চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু হবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার ব্যবস্থার কথা বলা হবে ইশতেহারে। শিক্ষাব্যয় কমিয়ে আনা, অপরিকল্পিত শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসা, উচ্চতর গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করার অঙ্গীকারও থাকবে এতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পরও দেশে চাকরি মিলছে না। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জামায়াত চায় কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে গ্রাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লাখ গ্রাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে। এছাড়া মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়া এবং প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ প্রদান করার কথা বলা হবে। গরিবের মেধাবী সন্তানও যেন হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজে পড়তে পারে এমন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে চায় দলটি। সব নিয়োগ মেধাভিত্তিক হবে বলেও ইশতেহারে যুক্ত করতে চায় দলটি।

জামায়াতের ইশতেহারে ‘আইসিটি ও ভিশন ২০৪০’ শিরোনামে উল্লেখ থাকছে নানা পরিকল্পনার কথা। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে ২০ লাখ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা হবে। ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন করা হবে। আইসিটি সেক্টর থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করার কথা উল্লেখ থাকবে এতে। আইসিটি খাতে সরকারের ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারণ করা হবে শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য।

অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে জামায়াতের ইশতেহারে। ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু করা হবে যাতে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আগামী ৩ বছরে সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান করা হবে। ব্যবসাবান্ধব পলিসি তৈরি করা হবে। সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে।

স্বাস্থ্য খাতকে পুরোপুরি সেবা হিসাবে গ্রহণ করার কথা বলা হবে জামায়াতের ইশতেহারে। ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। ৬৪ জেলার প্রতিটিতে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসার অঙ্গীকার থাকবে।

রেমিট্যান্স সংক্রান্ত বিষয়ে ইশতেহারে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে ৫-৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা থাকবে। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবী, গবেষক, শিক্ষকদের ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসাবে দেশে নিয়ে আসার কথা উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে।

এছাড়া দেশীয় শিল্পের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধানের মাধ্যমে দেশকে আত্মনির্ভরশীল করার পরিকল্পনার কথা থাকবে ইশতেহারে। আমদানি-রপ্তানিতে গতি ও সততা আনতে বদ্ধপরিকর জামায়াত। থাকবে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক নীতি প্রণয়নের পরিকল্পনার কথাও।

কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইশতেহারে থাকবে নানা পরিকল্পনার কথা। বিশেষ করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার উপায় বের করতে কৃষি গবেষণার ওপর জোর দেওয়া হবে।

প্রশাসনিক সংস্কার জামায়াতের একটি বড় কর্মসূচি। প্রশাসনের কাজে গতি আনা, ঘুস, দুর্নীতি দূর করা দলটির অন্যতম অঙ্গীকার। এজন্য নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণে সততা ও দেশপ্রেমকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা থাকবে জামায়াতের। এজন্য তাদের মৌলিক প্রশিক্ষণে আনা হবে গুণগত পরিবর্তন। দেশপ্রেম ও সেবার মানসিকতা তৈরিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া হবে। ভুক্তভোগী মানুষ যেন প্রতিকার পায়, প্রকৃত সেবা পায় সেটা নিশ্চিত করার থাকবে কার্যকর পদক্ষেপ।

পররাষ্ট্রনীতিতে ‘কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়-সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ এমন নীতি অনুসরণ করার কথা উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। তবে যে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সমমর্যাদার বিষয়টিকে পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশকে সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা থাকবে জামায়াতের ইশতেহারে। আধুনিক সমরাস্ত্র বৃদ্ধি করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পরিকল্পনাও থাকবে।