জীবিকার তাগিদে মাত্র ১১ বছর বয়সেই বিত্তবান ব্যক্তির বাড়িতে গৃহকর্মী হিসাবে পাঠানো হয়েছিল শিশু ময়নাকে (ছদ্মনাম)। আশা ছিল সামান্যই-দুমুঠো ভাত আর একটু নিরাপদ জীবন। কিন্তু সেই আশাই পরিণত হয় বিভীষিকায়। দিনের পর দিন তার ওপর চলে পৈশাচিক নির্যাতন। ধনাঢ্য মনিবের বাড়িতে শিশুটির বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। তার ছোট শরীরজুড়ে ক্ষত আর ক্ষত, যা দেখলে গা শিউরে ওঠে।
পুলিশ জানায়, খুন্তি গরম করে শিশুটির শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করায় হাত ও পায়ের হাড় ফেটে যায়। গলা, হাত ও পায়ের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় নির্যাতনের কালচে দাগ। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় মামলা হলে গ্রেফতার করা হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রভাবশালী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বিথীকে। সোমবার তাদের আদালতে তোলা হলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজু আহমেদ আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই তাহমিনা আক্তার।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, শফিকুর রহমানের নিজেরও সন্তান আছে। দুর্নীতির টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েরা বিদেশে আয়েশি জীবনযাপন করছে। অথচ ১১ বছরের এই ছোট্ট শিশুকে কী অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, রোববার রাতে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই রোমের মিয়া আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন জামিন চেয়ে আবেদন করেন। জামিন শুনানিতে তিনি আসামিদের নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, শফিকুর রহমান একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি অধিকাংশ সময় সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকেন। এসব ঘটনার সঙ্গে তিনি বা তার স্ত্রী কোনোভাবেই জড়িত নন। শিশুটিকে সুস্থ অবস্থায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের তীব্র বিরোধিতা করে। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এসআই তাহমিনা আক্তার বলেন, পেটের দায়ে ১১ বছরের শিশুটিকে তার পরিবার কাজে দিয়েছিল। ওই বাসায় যাওয়ার পর থেকেই তাকে নিয়মিত নির্যাতন করা হয়েছে। তার শরীরের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে শিশুটির বাবা, হোটেল কর্মচারী গোলাম মোস্তফা এ ঘটনায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, শফিকুর রহমানের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর তাকে জানায়, বাসায় শিশু দেখাশোনার জন্য একটি ছোট মেয়ে প্রয়োজন। পরে আলোচনার পর গত বছরের জুন মাসে ময়নাকে ওই বাসায় কাজে দেন তিনি। শর্ত ছিল-মেয়ের সব খরচ ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেবে গৃহকর্তৃপক্ষ। সবশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন গোলাম মোস্তফা। এরপর দীর্ঘ সময় মেয়ের সঙ্গে আর দেখা করতে দেওয়া হয়নি। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বিথী ফোন করে জানায়, ময়না অসুস্থ তাকে নিয়ে যেতে। সন্ধ্যায় মেয়েকে নিয়ে আসার সময় গোলাম মোস্তফা দেখেন, ময়নার দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম। মেয়েটি ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিল না। পরে তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার সময় ময়না জানায়, ২ নভেম্বরের পর থেকে বিভিন্ন সময় তাকে মারধর করা হয়েছে, এমনকি গরম বস্তু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে।