ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি আগামী শুক্রবার নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে। ইশতেহারে দলটির ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ এবং তরুণ ভোটারের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো জনমুখী এবং জীবনঘনিষ্ঠ সেবার বিষয়গুলো বিশেষ জায়গা পাবে। এছাড়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণের পাশাপাশি অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। আলেম-ওলামা, সংখ্যালঘু, কৃষকের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকারের প্রতিশ্রুতিও থাকবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিএনপির ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাক-স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়গুলো ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিংসহ ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে সামনে আনতে চাইছে বিএনপি।
সূত্র জানায়, ইশতেহারে জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনা গুরুত্ব পাচ্ছে। কওমি মাদ্রাসা উন্নয়ন, ইসলামিক গবেষণা তহবিল গঠন, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন ও ধর্মচর্চার বাধাহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকবে। পরিবেশ রক্ষায় সারা দেশে খাল ও নদী পুনর্খনন, ২৫ কোটি গাছ রোপণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জাতীয় ইস্যুগুলোও ইশতেহারে স্থান পাবে। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি প্রায় সাড়ে চার কোটি যুবকের কর্মসংস্থান, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি ও বেকার ভাতার মতো পরিকল্পনা থাকছে। সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, নিরাপত্তা সেল, উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর কার্যক্রম চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে।
যুব সমাজকে টার্গেট করে বিএনপি বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করা হচ্ছে ইশতেহারে। এর মধ্যে রয়েছে-এক কোটি নতুন চাকরি, স্টার্টআপ ফান্ড, আইটি প্রশিক্ষণ, বিদেশে নতুন শ্রমবাজার ও মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতি। কৃষককে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহারে কৃষি উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিঋণ সহজ করা এবং ধান-চাল কেনার স্বচ্ছ ব্যবস্থা করার অঙ্গীকারও থাকবে। নারী নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল গঠন, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি এবং সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথাও ইশতেহারের অংশ হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের আদলে বাংলাদেশে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ তৈরির পরিকল্পনা ও নির্বাচিত হলে ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসাবে রাখছে দলটি।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৭ অঙ্গীকার : তথ্যপ্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাতটি অঙ্গীকার যুক্ত হবে ইশতেহারে। সরকার গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে ন্যাশনাল ই-ওয়ালেট চালু করবে বিএনপি। বিএনপি সরকার পরিচালনার সুযোগ পেলে ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তিবিদদের সুবিধার জন্য ‘পেপাল’সহ জাতীয় ‘ই-ওয়ালেট’ চালু করবে। যাতে দৈনন্দিন কেনাকাটা, বিল, ফি, কর-সবই সহজে ডিজিটালভাবে পরিশোধ করা যায়। স্লোগান হবে-‘ধানের শীষের অঙ্গীকার-লেনদেন হবে ডিজিটাল।’ স্কুল-কলেজ, অফিস, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, বিমানবন্দরসহ নির্দিষ্ট জনবহুল স্থানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা চালু করা হবে।
ধানের শীষের অঙ্গীকার-ইন্টারনেট হবে সবার।
১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের বিষয়ে বলা হয়েছে-আইসিটি খাতকে দ্রুত সক্রিয় করতে সাইবার নিরাপত্তা, বিপিও, এআই-ডেটা, সেমিকন্ডাক্টর, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০সহ পাঁচটি খাতে সরাসরি দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরও আট লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করতে চায় বিএনপি। স্লোগান থাকবে ‘ধানের শীষের অঙ্গীকার-থাকবে না কোনো দক্ষ বেকার।’ শিক্ষার মান বাড়াতে এআই-ভিত্তিক কানেক্টেড স্কুল ও লার্নিং সিস্টেমের ব্যবস্থা করা হবে। তাৎক্ষণিক ও জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ও স্বাস্থ্যসেবা, অটোমেশনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে পুলিশি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অঙ্গীকার থাকবে।
‘ধানের শীষের অঙ্গীকার-দেশের প্রযুক্তি গড়বে আন্তর্জাতিক বাজার’-এ স্লোগানে সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার থাকবে ইশতেহারে। স্লোগান হবে ‘ধানের শীষের অঙ্গীকার-নিরাপদ হবে সাইবার স্পেস, রক্ষা হবে নাগরিক অধিকার।’ বিএনপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে ‘ক্লাউড-ফার্স্ট’ কৌশলে দেশের প্রথম এআই-চালিত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস স্থাপন করা হবে। স্লোগান হবে-‘ধানের শীষের অঙ্গীকার-দেশের প্রথম এআই-চালিত ডেটা সেন্টার।’