Image description

নির্বাচনী প্রচারের চেনা দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে । দেয়ালজুড়ে স্লোগান , অলিগলিতে পোস্টারের জঙ্গল— এবার আর এসব দেখা যাচ্ছে না ৷ নির্বাচন কমিশনের বিধিতে পোস্টার ও দেয়াললিখন নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রার্থীরা বাধ্য হচ্ছেন প্রচারের ধরন পাল্টাতে । সেই শূন্যতা পূরণ করছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—ফেসবুক , ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংবাদভিত্তিক , বিনোদন বা ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট । প্রার্থীদের বড় একটি অংশ প্রচারের বাজেট নতুন করে সাজাচ্ছেন । পোস্টার ছাপা , দেয়াল রং , ব্যানার লাগানোর খরচ কমিয়ে সেই অর্থ ঢালা হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে । 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন , কনটেন্ট তৈরি , পেজ ম্যানেজমেন্ট , ডেটা বিশ্লেষণ — সব মিলিয়ে গড়ে উঠছে আলাদা একটি ' ডিজিটাল টিম ' । ডিজিটাল প্রচারের এই বিস্তার নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেও এর ব্যয় , স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে ।

প্রার্থীদের এই ডিজিটাল প্রচার কীভাবে দেখছেন, জানতে চাইলে সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন , ‘ এটা ( ডিজিটাল প্রচারণা ) বাস্তবতা । ভবিষ্যতে এগুলো আরও ব্যাপকভাবে হবে । এগুলো নজরদারি করা দরকার । কারণ , ডিজিটাল প্রচারমাধ্যম অপব্যবহার হতে পারে । তাই এগুলোর ব্যাপারে আমাদের নির্বাচন কমিশনে একটা ইউনিট থাকা দরকার , যারা এগুলো মনিটর করবে । ” প্রার্থীদের ডিজিটাল টিমগুলো নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি , পোস্টের রিচ বাড়ানো , মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারণা পর্যবেক্ষণের কাজ করছে ।

ফেসবুকেই সবচেয়ে বেশি জোর প্রার্থীদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক । ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার চালাতে সাম্প্রতিক এক সপ্তাহেই প্রার্থীরা প্রায় ৪১ হাজার ডলারের বেশি খরচ করেছেন ; বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার বেশি । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে , ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যয়ের দিক থেকে এখন পর্যন্ত শীর্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম - ৭ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী । আর কাদের চৌধুরী । আর অনুসারীর সংখ্যায় সবার আগে ঢাকা -৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা . তাসনিম জারা । নির্বাচনী প্রচারণার

বাকি দিনগুলোতে এই ব্যয় আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন । ফেসবুকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটার ' অ্যাড লাইব্রেরি ' অনুযায়ী , ১৭ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় হয়েছে ৪১ হাজার ৯১৫ ডলার । ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ১৩৪ ডলার । আর ২৬ অক্টোবর থেকে ২৩ জানুয়ারি — এই তিন মাসে ব্যয়ের পরিমাণ ২ লাখ ৭২ হাজার ৫১ ডলার । প্রচারের জন্য ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মীও নিয়োগ দিচ্ছেন প্রার্থীরা । কর্মীও নিয়োগ দিচ্ছেন প্রার্থীরা । কেউ কেউ এর পেছনে দেদার অর্থ ব্যয় করছেন । কেউ আবার নিচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক ।

এ ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে আছেন ডা . তাসনিম জারা । তিনি ফেসবুকে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করতে নতুন একটি ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন । এই ক্যাম্পেইন শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৮ হাজার ৪৮২ জন স্বেচ্ছাসেবক পেয়েও গেছেন তিনি । নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ফেসবুকসহ অনলাইন মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করছেন প্রার্থী ও দলগুলো । ফেসবুকে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের আবেদন করে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা তহবিল সংগ্রহ করেন তাসনিম জারা । জাতীয় নাগরিক পার্টি ( এনসিপি ) নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে । এই দলটির অনেক প্রার্থী সামাজিক

যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন জানিয়ে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করছেন । এবি পার্টি , আমজনতার দলের নেতারাও একই পথে হেঁটেছেন । এ ছাড়া প্রার্থী ও দলগুলো অনলাইন মাধ্যমে রিলস প্রতিযোগিতা , মতামত চেয়ে সমর্থক যুক্ত করা , ভিডিও ও গান আপলোড করাসহ নানাভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার ইতিবাচক হলেও এই মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা ।

এ বিষয়ে ফ্যাক্টচেকিং প্রশিক্ষক শুভাশীষ দীপ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রে প্রার্থী বা প্রচারকারী এবং যিনি বা যাঁরা দেখছেন, সবার সতর্ক হওয়া প্রয়োজন । কারণ , সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে যেকোনো কনটেন্ট খুব কম সময়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব । ভুল তথ্য বা এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করাও খুব সহজ । প্রার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কাও থাকে । তাই যিনি প্রচার করছেন এবং যিনি দেখছেন — দুই পক্ষকেই এই মাধ্যমে সতর্ক হতে হবে ।

কে কত খরচ করছেন মেটার হিসাব বলছে , গত সাত দিনে বাংলাদেশে তাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে ডলার খরচে শীর্ষ ২০ টি পেজের মধ্যে ১৫ টিই রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দল - সম্পর্কিত । এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম -৭ আসনের প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরীর নামের ফেসবুক পেজ । সাত দিনে এখান থেকে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১১০ ডলার । দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ‘ মার্টসেক্টর ’ (২ হাজার ৪ ডলার ) । এটি একটি তৈরি পোশাক ব্র্যান্ডের পেজ হলেও সম্প্রতি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম ও প্রতীক অঙ্কিত চাদরের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে ।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাগেরহাটের ১ , ২ ও ৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিমের ভেরিফায়েড পেজ ; এখান থেকে সাত দিনে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৬২৩ ডলার । চতুর্থ স্থানে আছে ঢাকা -১৫ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খানের নামে থাকা পেজ । সাত দিনে এখান থেকে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩১৬ ডলার । ডলার খরচে শীর্ষ বিশের মধ্যে নয়টি পেজ বিএনপি - সংশ্লিষ্ট , তিনটি জামায়াতে ইসলামী - সংশ্লিষ্ট এবং একটি জাতীয় নাগরিক পার্টি - সংশ্লিষ্ট । বাকি দুটি পেজ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের । প্রার্থী বা দলের নিজস্ব পেজ ছাড়াও বিভিন্ন নামহীন বা ছদ্মনামের পেজ , প্রোফাইল ও গ্রুপ থেকে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হচ্ছে । ফলে বাস্তবে কোনো প্রার্থীর পক্ষে মোট কত ডলার ব্যয় হচ্ছে , তার নির্ভুল হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না ।

মেটা অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী , ফেসবুকে এমন ৮৩৬ টি পেজ রয়েছে , যেগুলো থেকে গত সাত দিনে ১০০ ডলারের বেশি ব্যয় করা হয়েছে । এসব পেজের মধ্যে যেমন সরাসরি রাজনৈতিক দল বা নেতার নামে পেজ আছে , তেমনি রয়েছে ছদ্মনামের পেজ — যেগুলো নির্দিষ্ট দল বা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে । নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন , ‘ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীরা কীভাবে প্রচার চালাবেন , তা বিধিমালায় উল্লেখ আছে । তাঁরা সেটা মানছেন কি না , তা দেখা হবে । নির্বাচন শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয়ের হিসাব দাখিল করতে হবে । আমরা তা যাচাই করব । '

অনুসারীতে এগিয়ে তাসনিম জারা ডলার ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষ বিশে না থাকলেও অনুসারীর সংখ্যায় দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সবার ওপরে রয়েছেন তাসনিম জারা । তাঁর নামের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অনুসারী ৭১ লাখের বেশি । ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে তাঁর অনুসারী ৬ লাখ ৪২ হাজার । এ ছাড়া বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর একাধিক অ্যাকাউন্ট রয়েছে । শীর্ষ রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অনুসারী ৫৭ লাখ । জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড পেজে অনুসারী ২৩ লাখ । জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে অনুসারী ১৪ লাখ এবং ভেরিফায়েড পেজে ১২ লাখ ।

বিধি মানছেন না অনেক প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের ‘ রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা , ২০২৫ ' অনুযায়ী , প্রার্থী বা তাঁর এজেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন । তবে প্রচার শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম , অ্যাকাউন্ট আইডি ও ই - মেইল ঠিকানা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে । একাধিক রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে , অনেক প্রার্থী এখনো এই তথ্য জমা দেননি । ডলার খরচে শীর্ষে থাকা হুমাম কাদের চৌধুরীও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম - সম্পর্কিত তথ্য দেননি বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে ।

এ বিষয়ে তাঁর এলাকা চট্টগ্রাম- ৭ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুল হাসান আজকের পত্রিকাকে বলেন , “ আমার জানামতে , হুমাম কাদের চৌধুরী তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য দাখিল করেননি । শুধু তিনি নন , এই আসনের অন্য প্রার্থীরাও এখন পর্যন্ত তথ্য দেননি । ’ এ বিষয়ে হুমাম কাদের চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি । তাঁর দুটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি ।

তবে তাঁর ব্যবস্থাপক মাহবুবুল আহসান দাবি করেন , নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব তথ্য দেওয়া হয়েছে । ঢাকার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান , অনেক প্রার্থীই এখন পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য দেননি । তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন কি না, তা নজরদারির জন্য চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি ।

ডিজিটাল মাধ্যমে ভোটের প্রচারের প্রভাব সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নেহাল করিম গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, যেকোনো বিষয়ের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নেতিবাচক দিকও থাকে । ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারও এর ব্যতিক্রম নয় । দেয়াললিখন , পোস্টারের মাধ্যমে প্রচারের চেয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচারের সুবিধা বেশি । এই মাধ্যমে কিছু ঝুঁকিও অবশ্য রয়েছে । তবে সেগুলো মোকাবিলার পথ বের করে এই মাধ্যমে প্রচারকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন ।