Image description

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচারণায় ব্যাপক তৎপর অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারি সব দপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত সব স্তরে গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচারণায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোর তৎপরতা চালাতে বলা হয়েছে। গণভোট কী এবং এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে বোঝাতে সম্প্রতি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। এর পরই ‘হ্যাঁ’র পক্ষে সরকারের উপদেষ্টাদের পাশাপাশি সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থাও ঝাঁপিয়ে পড়েছে মাঠে।
সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে জনগণের স্বার্থ রক্ষিত হবে বলে প্রচার করতে বলা হয়েছে।

‘দেশের চাবি আপনার হাতে, পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ বলুন’—এই বার্তা প্রচার জোরদার করতে সরকারি কর্মচারীদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও তুলে ধরতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে সরকারি দপ্তরগুলোর ভবনের ভেতর-বাইরে শোভা পাচ্ছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন। ‘হ্যাঁ’ জয়ী করতে সরকারের সব দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, সংস্থা, করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২১ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রচারে নেমেছেন।

বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে প্রশাসনে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের সচিব থেকে শুরু করে অফিস সহায়ক পর্যন্ত কর্মচারীরা বলছেন, গণভোট অনুষ্ঠান বাস্তবায়নের দায়িত্বে সরকার। জনগণ ইচ্ছামতো ভোট দেবে। অথচ সরকারি টাকা খরচ করে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে খোদ সরকারই।
সরকার ও বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে থাকলে কেন বিপুল অঙ্কের সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ করা হচ্ছে? একটি অধ্যাদেশ জারি করলেই তো হয়!

এদিকে সরকারের একটি পক্ষ নেওয়াকে ভালো চোখে দেখছেন না প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, জনসচেতনতা বাড়াতে সরকার কাজ করতে পারে। তারা কোনো পক্ষ নিতে পারে না। সরকারের পক্ষ নেওয়া ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বিরোধীরা ‘কারচুপি’র অভিযোগ তুলতেই পারে। বলতে পারে, রিটার্নিং, প্রিজাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ‘হ্যাঁ’কে জয়ী করেছেন।
অতীতের সরকারের ‘দালালি’ করায় অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরসহ নানা ধরনের শাস্তি দেওয়ার নজির রয়েছে।

জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, “সরকার গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে পারে। সরকারের একটি পক্ষ নেওয়া ঠিক নয়। তারা নিরপেক্ষ থাকলেই ভালো হতো। সরকার যে পক্ষ নিয়েছে সেটি জয়ী হলে অন্য পক্ষ ‘কারচুপি’র অভিযোগ তুলতেই পারে। বলতে পারে, রিটার্নিং, প্রিজাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ‘হ্যাঁ’কে জয়ী করেছে।”

অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কাজ করেন এমন একজন সাবেক আমলা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের কথামতো কাজ করার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। অনেককে ওএসডি করেছে। অনেক দক্ষ কর্মকর্তাকে কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। তাহলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার চাইলে গণভোটসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে পারে। এটা তো ঠিক নয়। সবকিছু বিদ্যমান আইন মেনেই করা উচিত।’

জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সরকারের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সম্পৃক্ত করার নির্দেশনা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। গত ১৮ জানুয়ারি এক চিঠিতে গণভোট ২০২৬ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরকে তাদের সেবাগ্রহীতা এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনার পর সরকারের প্রায় ২১ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সবাই প্রচার চালাচ্ছেন। সরকারের সচিব থেকে শুরু করে একজন সাধারণ কর্মচারী (প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড) পর্যন্ত সবাই গণভোটের সচেতনতামূলক প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটা জনগণ বুঝতে পারছে কি না, তা নিয়ে সরকার চিন্তিত। এ জন্য সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে গণভোটের প্রচারে। আর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সারা দেশে প্রচারের বিষয়টি মনিটর করছে। প্রচারের বিষয়টি মনিটর করার জন্য এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৩১টি মনিটরিং টিম গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের সমন্বয়ে এসব টিম সারা দেশের জেলা পর্যায়ের প্রচার ঠিকভাবে চলছে কি না, তা মনিটর করছে। একেকটি মনিটরিং টিম জনসচেতনতা বাড়াতে অন্তত দুটি জেলার প্রচারে ব্যানার, লিফলেট, টিভিসি, আঞ্চলিক গানসহ অন্য যেসব উদ্যোগ ঠিকভাবে নেওয়া ও কার্যকর করা হচ্ছে কি না, তা মনিটর করছে।

এদিকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে (অধীন সংস্থাসহ) মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রচারে কী কী করতে হবে তার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরে (সচিবালয়, প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের) অবশ্যই গণভোটবিষয়ক ন্যূনতম দুটি ব্যানার (প্রয়োজনে আরো বেশিসংখ্যক) প্রদর্শনের এবং সরকারি যোগাযোগে গণভোটের লোগো প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সরকারের এই নির্দেশনা অনুসরণ করছে কি না তা দেখার দায়িত্ব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে দেওয়া হয়েছে। সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গণভোটবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই প্রশিক্ষণে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনলাইনে যুক্ত করা হয়। তা ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) সঙ্গে সমন্বয় করে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে।

সব মন্ত্রণালয়, বিভাগসহ সব দপ্তরপ্রধানকে (প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা ও মাঠ পর্যায়ের) সরকারি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গণভোট বিষয়ে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ওয়ার্ডভিত্তিক জনগণের মধ্যে প্রচারের ছবি সংশ্লিষ্ট ইউএনও/পৌরসভা প্রশাসক, জেলা প্রশাসক/সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসকদের ট্যাগ করে তাঁদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রচার করতে বলা হয়েছে। পর্যটনস্থল এবং আশপাশের হোটেল-রেস্টুরেন্ট, বাসস্ট্যান্ড, ফেরি, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, এয়ারপোর্ট প্রভৃতি জনবহুল স্থানে নির্বাচনী ব্যানার বা পোস্টার লাগাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও ফেরিতে লিফলেট প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণভোটবিষয়ক ব্যানার অবিলম্বে প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমাজে গণভোট বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে বলা হয়েছে, যাতে তাঁরা গণভোটবিষয়ক প্রচারে ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগকে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রচারের নির্দেশ দিয়ে জনবহুল স্থানে ডিজিটাল বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন লাগানোসহ মাইকিং করতে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্রাম পুলিশকে গণভোট সম্পর্কে সচেতন করার নির্দেশ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, তারা যাতে গ্রাম পর্যায়ে এই প্রচার চালায়। গণভোট প্রচার কার্যক্রম গতিশীল করতে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদের রাজস্ব বাজেট থেকে প্রয়োজনীয় ব্যয় করার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এনজিওবিষয়ক ব্যুরোকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও ইউএনওর সঙ্গে সমন্বয় করে এনজিওর মাধ্যমে প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, যেসব স্থানে সরকারি কোনো প্রকল্প বা প্রোগ্রামের মাধ্যমে পৌঁছা যাচ্ছে না সেখানে কিভাবে এনজিওকে ব্যবহার করা যায় তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়কে দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাকে (ইমাম, পুরোহিত, পাদ্রি, বৌদ্ধ ভিক্ষু প্রভৃতি) মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা বা অন্যান্য ধর্মীয় স্থানকে ব্যবহার করে ব্যাপক প্রচার চালাতে বলেছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে গণভোটবিষয়ক ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল প্রচারের জন্য একটি টিম গঠন করার নির্দেশ দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অপতথ্য প্রতিরোধে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামারদের দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে প্রচারকাজের সুবিধার্থে দ্রুত ৩০টি ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করার নির্দেশ দিয়ে কিভাবে গণভোট দিতে হবে তা প্রচার করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘ভোটের গাড়ি’তে সব জেলায় এবং সর্বোচ্চসংখ্যক উপজেলায় সচেতনতামূলক ভিডিও প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। দেশের সব সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যানার প্রদর্শন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভোটারদের গণভোট সম্পর্কে সচেতনতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এমনটা বলা হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশনায়।

জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা তথ্য কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত নির্বাচনী প্রচারের সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উপজেলা/ওয়ার্ডে প্রচার চালাতে ডিসি তাঁর জেলার সব কর্মকর্তা, পৌরসভা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করে বাস্তবায়ন করবেন—এমন নির্দেশনার পাশাপাশি ডিসি এই প্রচারণা কার্যক্রমকে গতিশীল করতে জেলা পর্যায়ের অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদেরও দায়িত্ব দিতে পারবেন বলা হয়েছে।