Image description

স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা উন্নয়নের নামে প্রস্তাবিত একটি বৃহৎ প্রকল্পে অস্বাভাবিক ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনার মাধ্যমে বড় ধরনের অপচয় রোধ করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৩ হাজার ২২ কোটি টাকার যে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা পুনর্মূল্যায়নের পর প্রায় চার হাজার ২৮৭ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত ব্যয় আট হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে এবং প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত ও জনমুখী কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

জানা গেছে, গত মাসে প্রকল্পটি একনেকে তোলা হলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ফের পাঠাতে বলা হয়, যা গত রবিবার একনেক সভায় অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

প্রকল্পটির নাম স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা উন্নয়ন ও ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প। এটি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত চার বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকা হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশ নির্ধারণ করা হলেও চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম প্রস্তাবে ৩৬৫টি অনাবাসিক ভবন নির্মাণে যেখানে তিন হাজার ১৮৪ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল, সেগুলো অপ্রয়োজনীয় উল্লেখ করে মাত্র ৪৮টি ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রথমে যেখানে ১১ হাজার ৮৭০টি কম্পিউটার কেনার প্রস্তাব করা হয়েছিল, একনেক তা কমিয়ে মাত্র ১২৭টির অনুমোদন দিয়েছে। এখানে সাশ্রয় হয়েছে ৮০৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ২৫৯ কোটি, সেমিনার/কনফারেন্সে ১০৩ কোটি ও পরামর্শকে ১৬৬ কোটি টাকা অপ্রয়োজনীয় বলে কাটছাঁট করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক প্রস্তাবে অটোমেশন, পরামর্শক সেবা, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ, সম্মানি ভাতা, অনাবাসিক ভবনের নির্মাণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের খাতে অস্বাভাবিক অঙ্কের অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এসব ব্যয়ের বড় অংশ সরাসরি জনগণের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে একনেক সভায় মত দেন সদস্যরা। ফলে এসব খাত পুনঃ যাচাই করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

একনেক সভায় বলা হয়, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের সব বিভাগে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, পুষ্টিসেবা এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা। কিন্তু প্রাথমিক প্রস্তাবে মাঠ পর্যায়ের সেবা বৃদ্ধির তুলনায় প্রশাসনিক ব্যয় ও পরামর্শকনির্ভর কার্যক্রমে বেশি অর্থ বরাদ্দের প্রবণতা দেখা যায়।

এতে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সাধারণ মানুষের সরাসরি উপকার পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তৃতি, মাঠ পর্যায়ে পুষ্টিসেবার উন্নয়ন, উপজেলা পর্যায়ে অসংক্রামক রোগ শনাক্ত ও নিবন্ধনব্যবস্থা জোরদারকরণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর ও সময়োপযোগী রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলায় উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও তাপপ্রবাহজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের মতামতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবার মান ও প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া শক্তিশালী হওয়ার মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আরো জবাবদিহিমূলক হবে। এতে জনগণের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য চাহিদা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্য খাতে বড় অঙ্কের প্রকল্পে ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফল অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিক ও পরামর্শক ব্যয় বেশি হওয়ায় মাঠ পর্যায়ের সেবায় তার প্রভাব সীমিত ছিল।

১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে চার হাজার ২৮৭ কোটি টাকা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে সংশ্লিষ্ট মহল স্বাস্থ্যের বড় লুটপাট কমানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। এতে সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে এবং সেই অর্থ অন্য জরুরি সামাজিক খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কলের কণ্ঠকে বলেন, সম্প্রতি শেষ চতুর্থ জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি কর্মসূচিতে অনেক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এখনো সেগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না জনবলের অভাবে। আমাদের এখন ভবন নির্মাণের চেয়ে সেবার মান বাড়ানোয় জোর দেওয়া উচিত।  এ বিষয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, আমাদের এখন ভবন নির্মাণের চেয়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে জোর দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্য খাতে এডিপি বাস্তবায়ন অনেক কম। এ খাতে পরিকল্পিত উন্নয়ন জরুরি।