Image description

সাভার মডেল থানার একদম নিকটেই সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে পরিত্যক্ত ভবনটি অবস্থিত। এ পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনটি যেন সিরিয়াল কিলিংয়ের হটস্পট। ভবনটিতেই আলোচিত ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান সম্র্রাট একের এক নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছেন। এই ভবন থেকেই পুলিশ উদ্ধার করেছে অজ্ঞাত ৫টি মরদেহ। তার মধ্যে একজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। বাকি ৪ জনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত সম্রাটের আসল পরিচয় প্রকাশ করেছেন পুলিশ।

সম্র্রাট নিজেকে ‘কিং সম্রাট এবং মশিউর রহমান খান সম্রাট বলে দাবি করলেও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী তার প্রকৃত নাম হচ্ছে সবুজ শেখ। প্রায় সময় সাভার মডেল থানার আশপাশে ঘুরে বেড়াতেন। সবশেষ গত রোববার জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর তার ভয়ঙ্কর রূপ প্রকাশ্যে আসে।

মঙ্গলবার সকালে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান তার পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। সম্র্রাট ওরফে সবুজ শেখ মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে। তিন ভাই চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সবুজ শেখ। তার বড় বোনের নাম শারমিন। সবুজের পর আরেক বোন ও আরেক ভাই, তারপর আরও দুই বোন। তাদের নানাবাড়ি বরিশালে। হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয়। গ্রামের সবাই তাদেরকে ভয়ঙ্কর এবং ডাকাত ফ্যামিলি হিসেবেই চিনেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান জানান, নিজ পরিচয় গোপন রেখে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাসমান নারীদের পরিত্যক্ত ওই ভবনের নির্জন স্থানে নিয়ে আসতো সিরিয়াল কিলার সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ। সেসব নারী অন্য কারও সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদেরকে হত্যা করতো বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। এ ছাড়াও সে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, হত্যাকাণ্ডের তথ্য ও পরিচয়সহ সকল তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তার গ্রামের বাড়িতে পুলিশের টিম পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ ঘটনার ৩-৪দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতলায় নিয়ে হত্যা করে সম্রাট। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে লাশ কাঁধে করে নিয়ে দোতলার টয়লেটে ঢুকিয়ে দু’জনকে একসঙ্গে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে ভবনটির আশপাশে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্তের পর অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে জিজ্ঞাসাবাদে সে ৬টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শেষে সবুজ শেখ ওরফে সম্র্রাটকে সোমবার রাতেই জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন আদালত। এদিকে, সিসিটিভি ফুটেজে যে তরুণীকে হত্যার পর কাঁধে করে নিয়ে যেতে দেখা যায়, সেই তরুণীর পরিচয় পাওয়া গেছে। হত্যার পর ভাইরাল হওয়া ওই তরুণীর আগের একটি সাক্ষাৎকার দেখে তার পরিবারের সদস্যরা সাভার মডেল থানায় ছুটে আসেন। সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, নিহতদের মধ্যে একজন তরুণী তানিয়া আক্তার। তার বাবার নাম মৃত জসীম। মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী তানিয়া মায়ের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরায় ভাড়া বাসায় থাকতো। চার বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। গত ১লা জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিল বলে জানিয়েছেন পরিরারের সদস্যরা। 

সাভার থানা পুলিশ জানায়, ভবঘুরে প্রকৃতির সম্রাট গত কয়েক বছর ধরে মূলত সাভার মডেল থানার সামনে, উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স, সাব- রেজিস্ট্রার অফিসের আশপাশ, সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও পাকিজার মোড়ে ঘোরাফেরা এবং রাত্রিযাপন করতো।  রোববার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে জোড়া খুনের পর গ্রেপ্তারকৃত সম্রাট নিজের যে নাম, বাবার নাম সালাম এবং মায়ের নাম রেজিয়াসহ ব্যাংক কলোনী এলাকার বাড়ির ঠিকানা বলেছে, তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে ওই এলাকায় ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান খান সম্র্রাট। সিরিয়াল কিলার সবুজ শেখ নিজের পুরো নাম ওই কাউন্সিলরের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলেছে। ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ৬ খুনের কথা স্বীকার করলেও ‘খুনের কারণ হিসেবে একেকবার একেক রকম দাবি করেছেন। সে একজন বিকৃত রুচির মানুষ, সাইকো প্যাথ।

এদিকে, গত ৩ মাসের ব্যাবধানে অবস্থিত সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে ৫টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ভবনটিকে সিরিয়াল কিলিংয়ের হটস্পট বলে মনে করেন স্থানীয়রা। প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয়রা জানান, সাভার সরকারি কলেজ, সাভার প্রেস ক্লাব মুখোমুখে স্থানে অবস্থিত পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে গত ৩ মাসে ৫ লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আমরাও আতঙ্কে আছি। এ সব ঘটনায় কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এবং আগের হত্যাকাণ্ডগুলোর রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে না পারায় এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যা নামলেই ভবনটি মাদকসেবী, ছিনতাইকারী ও অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে জেলা পরিষদ ও পৌরসভার মালিকানা জটিলতার ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সাভার কলেজের ঠিক সামনে এমন একটি মৃত্যুকূপ থাকায় সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছে অভিবাবক ও শিক্ষার্থীরা। 

প্রসঙ্গত: ৭ মাস আগে সাভার মডেল মসজিদের সামনে অজ্ঞাতনামা এক বৃদ্ধার (৭৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। তার নাতি মামলা দায়ের করলে পরে আসমা বেগম নামের এই বৃদ্ধার পরিচয় মিলে। এরপর ২০২৫ সালের ২৯শে আগস্ট পৌর এলাকার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের (৩০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই স্থানে ১১ই অক্টোবর অজ্ঞাতনামা এক নারীর (৩০) লাশ পাওয়া যায়। এরপর ১৯শে ডিসেম্বর সেখান থেকে অজ্ঞাতনামা আরও এক পুরুষের (৩৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সব ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলে কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে সিসিটিভি এবং লাইট লাগানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। সর্বশেষ ১৮ই জানুয়ারি রোববার পুলিশ দু’টি পোড়া লাশ উদ্ধার করে। এরপর সিসিটিভি ফুটেজে একটি লাশ সরাতে দেখে সম্রাটকে শনাক্ত করা হলে পুলিশ তাকে রোববার গ্রেপ্তার করে।