Image description

দেশ জুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি। ছোট-বড় সন্ত্রাসীদের হাতে হাতে অস্ত্র। সীমান্তের ফাঁকফোকর দিয়ে আসছে অস্ত্রের চালান। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও গুলি করে হত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে। হত্যা করা হচ্ছে রাজনৈতিক দলের ছোট-বড় নেতাকর্মীদের। চলছে চাঁদাবাজির মচ্ছব। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, দখলবাজি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মব আতঙ্কের মধ্যেই চলছে নির্বাচনী ডামাডোল। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে আছে নানা বিতর্ক। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রার্থী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সেখানে ভোটকেন্দ্র দখল হওয়ার শঙ্কা দেখছেন প্রার্থীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে ভোটের মাঠে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি থাকে ও সন্ত্রাসীরা প্রভাব বিস্তার করে। এক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যাহত হয়। তাই নির্বাচনের আগেই অভিযান চালিয়ে দাপিয়ে বেড়ানো সন্ত্রাসী, খুনি ও অস্ত্র উদ্ধার করে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। 

এবারের নির্বাচনে আগ্নেয়াস্ত্র একটা বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন আলোচনা খোদ নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায়ও উঠে এসেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী, দাগি আসামি, চরমপন্থি, জঙ্গিরাও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নিলেও কোনো সুখবর আসেনি। ফলে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। আর সারা দেশের প্রার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, উদ্বেগ, আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেশব্যাপী ভোটের মাঠে সন্ত্রাসী ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে সেটি নির্বাচনের আগে শুধু রুটিন কাজ সেরে দায়িত্ব সারবে পুলিশ প্রশাসন নাকি সমস্যার সমাধানে কার্যকরি পদক্ষেপ নিবে সেটি নিয়ে ভাবছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র, কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া অপরাধী, জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নির্বাচন প্রভাবিত করার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বাইরে সীমান্ত পার হয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র এখন সন্ত্রাসীদের হাতে। এ ছাড়া ছোট বড় সব অপরাধীদের দখলে এখন আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র ইতিমধ্যে বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করা হয়েছে। খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, প্রকাশ্যে প্রদর্শন করছে সন্ত্রাসীরা। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, লুট হওয়া অস্ত্র হাতবদল হয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী, চরমপন্থি, স্থানীয় সন্ত্রাসী ও পেশাদার অপরাধী এমনকি রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের হাতে চলে গেছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পেশিশক্তি প্রদর্শন, এমনকি ভোটের মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অস্ত্রগুলো ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। 

প্রশাসন ও পুলিশের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু করার পথে অবৈধ অস্ত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ঢালাও জামিন, সীমান্তে নিরাপত্তার দুর্বলতাসহ নানা চ্যালেঞ্জ ও আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিন বন্ধ রাখতে বিচার বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় বসা যায় কিনা, জামিনে থাকা অপরাধীদের গতিবিধি নজরে রাখা, কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের অবাধে মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধের ব্যবস্থা, কারাবন্দি অপরাধীদের কর্মকাণ্ড নজরে রাখা, সীমান্তে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়ানো, নতুন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিরাপত্তায় জোর দেয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন। 

উদ্ধার হয়নি ১৩৪০ আগ্নেয়াস্ত্র: গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের ৪৬০টি থানা ও ১১৪টি ফাঁড়ি ও গণভবনের দায়িত্বে থাকা এসএসএফের লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভিন্ন ভিন্ন নামে একের পর এক অভিযান চালিয়ে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। শেষতক গত ৫ই নভেম্বর এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে সরকার বড় অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করে। কিন্তু এই ঘোষণা দিয়ে একটি অস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি সরকার। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এরমধ্যে ১ হাজার ৩৩২টি এখনো উদ্ধার হয়নি। এ ছাড়া লুট হওয়া ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়নি আড়াই লাখ গোলাবারুদ। 

এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আগামী ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে সব বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিকটস্থ থানায় জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী আগামী ১৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গতকাল জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আবেদা আফসারী। 

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশে নিহত হয়েছেন ১৩১ জন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশ ও কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত ও চাঁদাবাজি কেন্দ্র করে ৯১৪টি সহিংসতা ঘটে। এসব সহিংসতায় নিহত ১৩১ জনের মধ্যে বিএনপি’র ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, ইউপিডিএফের ছয়জন, জামায়াতে ইসলামীর তিনজন, ইনকিলাব মঞ্চের একজন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন ও চরমপন্থি দলের একজন আছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে ৫৪টি সহিংস ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও তিনজন।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে রকম পরিবেশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দরকার সেটি হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো ও অনেক অপরাধী গ্রেপ্তারের দাবি করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ প্রতিনিয়ত যে ভয়াবহ ও গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে জড়িত মূল অপরাধীরা কীভাবে বাইরে থেকে যাচ্ছে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য রাতদিন কাজ করছে পুলিশ। ইতিমধ্যে অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিশেষ অভিযান চালিয়ে। পাশাপাশি অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে।