Image description
কী ঘটেছিল জঙ্গল সলিমপুরে

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র‌্যাব-৭ এর কার্যালয়ের সামনের মাঠের এক কোণে টাঙানো হয়েছে একটি শামিয়ানা। যা আড়াল করে রেখেছে এক চরম নির্মম সত্যকে। সেই শামিয়ানার ভেতরে শেষবারের মতো গোসল করানো হচ্ছে র‌্যাব’র উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে। আর ঠিক তার সামান্য দূরে, শামিয়ানা ঘেরা সেই জায়গাটুকুর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ৯ বছর বয়সী এক শিশু, সিদরাতুল মুনতাহা। অবুঝ মেয়েটি কিছুতেই বুঝতে পারছে না, ভেতরে কী হচ্ছে। তার কান্নার দমকে কেঁপে উঠছে শরীর। কেউ একজন এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন, কিন্তু মুনতাহার কান্না থামছে না। কান্নার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে কেবল একটি শব্দ ‘আব্বু’ ‘আব্বু’। কিন্তু হায়! শামিয়ানার ওপাশ থেকে যে আর কোনো সাড়া আসবে না, তা কে বোঝাবে এই ছোট্ট শিশুটিকে?

শামিয়ানার নিচ থেকে যখন মরদেহ জানাজার খাটিয়ায় তোলা হলো, মুনতাহার সেই ‘আব্বু’ ডাকটি আরও তীব্র হয়ে উঠলো। কিন্তু নিথর বাবা আজ নীরব, তার সাড়া দেওয়ার আর কোনো সাধ্য নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কঠিন কর্তব্য পালন করতে গিয়ে একটি সাজানো পরিবার আজ মরুভূমিতে পরিণত হলো। মঙ্গলবার দুপুরে তার মরদেহ পতেঙ্গায় আনা হলে তৈরি হয় এক অবর্ণনীয় শোকাবহ পরিবেশ। এক অভিযানে সব হারালো পরিবার গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জঙ্গল সলিমপুরের গহীন পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানার খোঁজে অভিযানে গিয়েছিল র‍্যাব’র একটি দল। সেখানে স্থানীয় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে চারদিক থেকে র‍্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটার সেই বর্বরোচিত হামলায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এ সময় তার আরও তিন সহকর্মী গুরুতর আহত হন। পরে জেলা পুলিশের বিশাল একটি দল গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে।

সন্তানদের দিশাহারা চাহনী কুমিল্লা সদরের অলিপুর থেকে আসা মোতালেবের স্ত্রী শামসুন্নাহার এখন একেবারেই বাকরুদ্ধ। কান্নার দমকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। বিলাপ করে কেবল বলছেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল। ছেলে-মেয়ে নিয়ে কী করবো? আমার স্বামীকে কেন হত্যা করা হয়েছে? এভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত রয়েছে।’ আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। সন্তানদের জড়িয়ে ধরে কেবল নিজের পড়ে যাওয়া ঠেকিয়ে রাখছিলেন কেবল। মোতালেবের বড় মেয়ে শামিমা জান্নাত দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার অকাল মৃত্যুতে সে পাথর হয়ে গেছে। অশ্রুসিক্ত চোখে সে প্রশ্ন করে, ‘বাবা তো দেশের জন্য কাজ করতে গিয়েছিলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়েছিলেন। কেন তাকে এভাবে মরতে হলো? যারা আমার বাবাকে মেরেছে, আমি তাদের বিচার চাই।’

অন্যদিকে, বড় ছেলে মেহেদী হাসান স্নাতক পড়ুয়া। বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেহেদী বলেন, ‘বাবা সব সময় বলতেন মা আর বোনদের দেখে রাখতে। ভালোভাবে পড়াশোনা করতে বলতেন। এখন আমরা কার কাছে যাবো? আমাদের কী হবে?’ সহকর্মীদের চোখে এক বীর যোদ্ধা মোতালেবের নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী তপন নাথ। তিনি বলেন, মোতালেব শুধু একজন দক্ষ কর্মকর্তাই ছিলেন না। মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক। সহকর্মীদের সুবিধা-অসুবিধার সব সময় খোঁজ রাখতেন তিনি। স্ত্রীর মতে, মোতালেব চাইলে পালিয়ে আসতে পারতেন, কিন্তু তিনি বীরের মতো শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছেন। তার এই দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ র‍্যাব’র ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বিচার ও শেষ বিদায় মোতালেবের দুই ভাই আমির হোসেন ও আবদুস সালাম ভূঁইয়া কুমিল্লা থেকে ছুটে এসেছেন। আট ভাইয়ের মধ্যে মোতালেব ছিলেন পরিবারের মধ্যমণি। ভাইয়ের এমন নৃশংস মৃত্যু তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। জানাজা শেষে সাংবাদিকদের সামনে আসেন র‍্যাব’র মহাপরিচালক এ কেএম শহিদুর রহমান। শোকাবহ পরিবেশে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানালেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে র‍্যাব’র প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত ৭৫ জন সদস্য প্রাণ দিয়েছেন। মোতালেবের এই আত্মত্যাগ বিফলে যাবে না। অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সদস্যদের অধিকার ছিল নিজের আত্মরক্ষায় গুলি করার। কিন্তু সাধারণ মানুষের জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতির শঙ্কায় তারা তা করেননি। তবে পুরো ঘটনা তদন্ত করে দেখার এবং ভুলত্রুটি থাকলে তা শুধরে নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

নিহত মোতালেবের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করে র‍্যাব মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান বলেন, শহীদ মোতালেবের স্ত্রী স্বামী হারিয়েছেন, সন্তানরা পিতা হারিয়েছে। আমরা সেই পিতা বা স্বামীকে এনে দিতে পারবো না। তবে নিশ্চিত করতে চাই-এই পরিবারের দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করেছি। একইসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের আইনের আওতায় এনে সাজা নিশ্চিত করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা এর পেছনে লেগে থাকবো। সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে অবৈধ কর্মকাণ্ডের এই আস্তানা আমরা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবো, এইটুকু কথা আমরা আপনাদের দিলাম। প্রসঙ্গত, নায়েব সুবেদার (জিডি) মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া কুমিল্লা জেলার সদর অলিপুর গ্রামে ১৯৭৮ সালের ১লা জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৃত আব্দুল খালেক ভূঁইয়া। তিনি ১৯৯৫ সালের ৭ই জুলাই বিজিবি’র চাকরিতে যোগ দেন। দেশের বিভিন্ন বিজিবি সেক্টরে চাকরি করেন। ২০২৪ সালের ২৬শে এপ্রিল র‌্যাব-৭ এ যোগ দেন। ৩০ বছর ৬ মাস ১২ দিন চাকরি করেন তিনি। 

কী ঘটেছিল জঙ্গল সলিমপুরে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন র‍্যাব সদস্যরা। সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন র‍্যাব কর্মকর্তা মো. মোতালেব। হামলাকারীরা প্রথমে তার সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পায়ে গুলি করে। পরে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে লাঠি, রড ও কাঠ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। 

জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের অনুসারীরাই এ হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনও ঘটনাস্থলে ছিল। একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ইয়াসিন এখন বিএনপি’র পরিচয়ে চলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। 

পুলিশ, র‍্যাব ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকালে ইয়াসিনের নেতৃত্বে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি কার্যালয় উদ্বোধনের কথা ছিল। এ উপলক্ষে সেখানে বিপুলসংখ্যক লোকজন জড়ো হয়। অন্যদিকে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী রুকন গ্রুপের (বহিষ্কৃত যুবদল নেতা) অনুসারী ও র‍্যাবের সোর্স মনা র‍্যাবকে জানান, ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইয়াসিন উপস্থিত থাকবেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম র‍্যাবের পতেঙ্গা কোম্পানি থেকে একটি টিম সেখানে অভিযান পরিচালনার জন্য যায়। বেলা পৌনে ৪টার দিকে অভিযানে যাওয়া র‍্যাব সদস্যদের ওপর ইয়াসিন গ্রুপের অনুসারীরা হামলা চালায়। একপর্যায়ে র‍্যাবের চার সদস্য ও সোর্স মনাকে আটকে ফেলা হয়। এ সময় র‍্যাবের অন্য সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। আটক রাখা সদস্যদের একটি কার্যালয়ে নিয়ে  তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয়।

পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, র‍্যাবের দু’টি মাইক্রোবাস (হাইয়েস) সলিমপুরে যাওয়ার পর লাঠিসোটা নিয়ে কিছু ব্যক্তি সেটিকে ধাওয়া দিচ্ছেন। একপর্যায়ে মাইক্রোবাস দু’টির কাঁচ ভাঙচুর করেন তারা। হামলার সময় ওই এলাকায় মাইকে ঘোষণা দেয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ঘোষণায় এলাকার ফটক আটকানোর জন্য বলছিলেন এক ব্যক্তি।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে বসে আছেন আহত কয়েকজন র‍্যাব সদস্য। তাদের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ। কক্ষের মেঝে রক্তে লাল হয়ে আছে। পুলিশ সদস্যরা আহত র‍্যাব সদস্যদের গাড়িতে তুলে দিয়ে আসছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকাল তিনটায় ওই এলাকায় বিশেষ গ্রেপ্তার অভিযানে গেলে ইয়াসিনের বাহিনীর সদস্য কালা ইয়াসিন, নুরুল হক ভাণ্ডারী, ওমর ফারুক, মো. কাজী ফারুকসহ ৪০০-৫০০ জনের একটি সন্ত্রাসী দল র‍্যাবের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় তারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে র‍্যাবের সদস্যদের মারধর ও একটি মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিকাল সাড়ে চারটার দিকে হঠাৎ মাইকে বাইরে মানুষ ঢুকে পড়ছে, সবাই বের হন, বাড়িঘর বাঁচান জাতীয় শব্দ শোনা যায়। সেই ঘোষণার পর মুহূর্তেই বিভিন্ন গলি থেকে লোকজন ছুটে যায় পাহাড়ের দিকে। অনেকে আবার বলেন, মাইকের শব্দটি ঠিক মসজিদের মতো লাগেনি, বরং কোনো মোবাইল স্পিকারের মতো শোনায়। এমনকি, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একই ধরনের শব্দ দুই জায়গা থেকে ভেসে আসে বলেও কেউ কেউ দাবি করেছেন।

স্থানীয় মসজিদ কমিটির একজন সদস্য বলেন, তাদের মাইক কেউ অপব্যবহার করেনি। তিনি দাবি করেন, ওই সময় মসজিদে কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি। এলাকায় কিছু অসাধু লোক আলাদা মাইক ব্যবহার করে বাড়িঘর রক্ষার নামে মানুষকে উত্তেজিত করতে পারে। আমরা নিজেরাই ঘটনাটিতে বিব্রত- বলেন কমিটির এই সদস্য।

র‍্যাব-৭, চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানান, সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ৪৩ জন র‍্যাব সদস্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযানে গিয়েছিলেন। এলাকাটিতে র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ দুষ্কৃতকারী র‍্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াসহ র‍্যাবের চারজন সদস্য গুরুতর আহত হন। তাদের পুলিশের সহযোগিতায় উদ্ধার করে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোতালেব হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।

র‍্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, তারা পরিকল্পনা করে এই হামলা চালিয়েছে। রাতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে, অভিযানের আগে হামলাকারীরা গভীর জঙ্গলের মধ্যদিয়ে পালিয়ে চলে যায়। তাদের ধরতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।  

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম খবর পেয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের উপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রশাসনের ভাষ্যমতে, প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা এখানে নতুন নয়। ২০২৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন। এর আগে ২০২২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি র‌্যাবের সঙ্গে এবং একই বছরের ২রা আগস্ট ও ৮ই সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি সমপ্রতি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েও সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। পাহাড়ের প্রবেশমুখে থাকা পাহারাদারদের সংকেত পেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আগেভাগেই পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেয় এবং অতর্কিত হামলা, যা এবারের র‍্যাবের অভিযানেও দেখা গেছে। 

সূত্র জানায়, মূলত জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে সরকারি খাস পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য করাই ইয়াসিনের কাজ। এ ছাড়া পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, দোকানপাট থেকে মাসিক কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাজি করেন ইয়াসিন। পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নব্বই দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি শুরু করেন। দখল ধরে রাখতে গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। এলাকাটি দুর্গম পাহাড়ে হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে যেতে পারতেন না। এই সুযোগে নিম্নআয়ের লোকজনের কাছে পাহাড়ি খাস জায়গা বিক্রি শুরু করে আক্কাসের বাহিনী। শুরুতে দুই শতক জায়গা বিক্রি হতো ২০ হাজার টাকায়। নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এসব জায়গা কেনাবেচা চলে আসছে। প্লট গ্রহীতাদের ছিন্নমূল সমবায় সমিতি নামক সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত করে বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানা সেবা দেয়ার কথা বলে নিয়মিত চাঁদা আদায় শুরু হয়। জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশ মুখে নির্মাণ করা হয় একাধিক লোহার গেট। পরিচয়পত্র ছাড়া কেউ গেট অতিক্রম করতে পারতেন না। প্লট বিক্রির টাকা ও পাহাড় দখল নিয়ে এক সময় বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। এর মধ্যেই র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান আক্কাস। এর কিছুদিন পর আক্কাসের সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা আলাদা দল তৈরি করেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইয়াসিন সীতাকুণ্ডের এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। আল মামুন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা। ইয়াসিন এলাকার আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন কাজী মশিউর গাজী ও সাদেক। যারা প্লট কিনেছেন তারাই এ দুই সমিতির সদস্য। বর্তমানে এ দু’টি সমিতিতে প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছেন।

গত ২রা জানুয়ারি সলিমপুরে খুন হন ইউনিয়ন শ্রমিক দলের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি মীর আরমান। তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়। গত ১৪ মাসে এলাকাটিতে চারজন খুন হয়েছেন। পুলিশ বলছে, সবক’টি খুনের পেছনে রয়েছে পাহাড়ি এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বজায় রাখা।

এলাকার বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিনকে সরিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরের দখল নিতে গত বছরের ৫ই আগস্টের পর হামলা চালান চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত) রোকন উদ্দিনের বাহিনী। তার সঙ্গে রয়েছেন কাজী মশিউর, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুর। কিন্তু ইয়াসিন বাহিনীর সঙ্গে তারা পেরে উঠছেন না। কাজী মশিউররা রয়েছেন জঙ্গল সলিমপুরের সলিমপুর অংশে আর ইয়াসিন রয়েছেন আলীনগরে।