Image description

আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান ও ব্যাপক প্রচারণা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। একটি নির্দলীয় সরকার হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যয় করে রাজধানী, সচিবালয়, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, এমনকি গ্রাম পর্যায়ে সরকারি সকল দফতর থেকে সাধারণ মানুষকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষ অবলম্বনের জন্য অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে সরকারের ‘নিরপেক্ষতা’ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই বাধ্য হয়ে সরকারের প্রচারণায় শামিল হচ্ছেন। 

এদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভিডিও বার্তায় এই আহ্বান জানান তিনি।

বার্তায় তিনি বলেন, “নতুন বাংলাদেশ গড়ার চাবি এখন আপনার হাতে। ‘হ্যাঁ’-তে সিল দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে। ‘হ্যাঁ’-তে আপনি নিজে সিল দিন। আপনার পরিচিত সবাইকে সিল দিতে উদ্বুদ্ধ করুন এবং তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসুন। দেশ পাল্টে দিন। ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ার এই সুযোগ নেবো।”

প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আগামী নির্বাচনে গণভোটে অংশ নিন। রাষ্ট্রকে আপনার প্রত্যাশা মতো গড়ে তোলার জন্য ‘হ্যাঁ’-তে সিল দিন।”

প্রধান উপদেষ্টার দফতর, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও মাঠ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সরকারি সব দফতরকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এছাড়া উপদেষ্টারা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে গিয়ে সুশীল সমাজ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোট চাচ্ছেন। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলেও এ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।

মব আতঙ্ক ও বাধ্যবাধকতা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক-বিমা এমনকি মার্কেটেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যানার-ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে। তবে এর পেছনে অনেকেরই রয়েছে ‘মব’ বা গণপিটুনি ও ভাঙচুরের আতঙ্ক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারের বিপক্ষে বা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলে তাদের ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। মূলত জানমাল, সম্পদ রক্ষা—এমনকি প্রাণহানি থেকে বাঁচতেই তারা সরকারের পক্ষে প্রচারণা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ বিষয়ে দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এম এ রউফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যেকোনও সূচকে ভোট দেওয়ার এখতিয়ার সাধারণ মানুষের থাকা উচিত। অতীতে তেমনই হয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সরকার যা চায় তার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া ঠিক হবে না। তাহলেই মব সৃষ্টি হবে। ফ্যাসিস্ট হিসেবে চিহ্নিত হবো। মান ইজ্জত এমনকি প্রাণটাও চলে যেতে পারে। তাই ঝুঁকি নিতে রাজি নই।”  

নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে প্রাণহানির সম্ভাবনার কথা জানান রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সরকারের পক্ষ অবলম্বন করছেন জানিয়ে এই দুই ব্যাংক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছি। গণভোটে কোনও নির্দিষ্ট পক্ষে অবস্থান নেওয়া সঠিক কিনা জানতে চাইলে তারা উভয়েই জানিয়েছেন, সরকার চাচ্ছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করুক। তাই আমরা ‘হ্যাঁ’ সূচকের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য ব্যাংকের গ্রাহকদের তথা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছি।

রাজধানীর একাধিক মার্কেট ভবনেও টানানো হয়েছে লম্বা ব্যানার। রাজধানীর কোনাপাড়ার সানফ্লাওয়ার মার্কেট কমিটির সভাপতি এম এ মহব্বত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ব্যবসায়ীদের হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। কোনও ঝুঁকি নিতে চাই না। এমনিতেই চাঁদাবাজদের অত্যাচার। এখন ফ্যাসিস্ট হিসেবে চিহ্নিত হলে সব শেষ হয়ে যাবে। তাই এই মার্কেটের ক্রেতা বিক্রেতাদের উদ্বুদ্ধ করতে আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যানার টানিয়েছি।”

বিশ্লেষকদের মত

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যখন নিজেই একটি পক্ষ হয়ে মাঠে নামে, তখন অন্য পক্ষের (না ভোট) জন্য জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে জনগণের সিদ্ধান্ত যেন তারা নিজেরাই নিতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা। 

এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মো. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের দিক বিবেচনায় রেখে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোটের পক্ষ অবলম্বন করা এই সরকারের দায়িত্ব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে মনে রাখতে হবে, এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জনগণের ওপর যেন কোনও কিছু চাপিয়ে দেওয়া না হয়। জনগণ যেন চাপ অনুভব না করেন। সরকারের উচিত হবে জনগণকে জানানো ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট দিলে কী হবে আর ‘না’র পক্ষে ভোট দিলে কী হবে। এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করাই হবে সরকারের কাজ। জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে সে কোন পক্ষে যাবে।

তিনি জানান, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোট দেওয়ার পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে যদি কোনও ব্যাংক বিমা এনজিওদের বাধ্য করা হয়, সেটি ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় সরকারকেই ভাবতে হবে। 

গণভোটে যা থাকছে

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ব্যালটে ভোটারদের কাছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি সম্মতি জানতে চাওয়া হবে। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর মাধ্যমে উত্তর দিতে হবে।

এতে চারটি প্রস্তাব থাকবে

(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।

(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।

(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে একমত হইয়াছে—সেগুলো বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদ নিশ্চিত করিতে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।

(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে। ভোট প্রদানের জন্য উপরের যেকোনও একটিতে টিক বা ক্রস চিহ্ন দিন।

সরকারের যুক্তি

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থানের কারণ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ছয়টি যুক্তি দেখিয়েছে। সেগুলো হলো—১) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেট সংস্কার আনুষ্ঠানিকতা নয়। ২) সুপরামর্শ গণতান্ত্রিক পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ৩) এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য নেতৃত্ব অপরিহার্য। ৪) আন্তর্জাতিক নজির এই পদ্ধতিকে সমর্থন করে। ৫) সরকারি প্রচারণা মানেই জোরজবরদস্তি নয়। ৬) নীতিগত লঙ্ঘন নয়, গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।

প্রেস উইং জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়, বরং তা দায়িত্বহীন নেতৃত্ব। অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেটই হলো সংস্কার নিশ্চিত করা। সরকারি প্রচারণাকে ‘জোরজবরদস্তি’ নয়, বরং ‘গণতান্ত্রিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখছে সরকার। প্রেস উইংয়ের মতে, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জনগণেরই থাকবে, সরকার কেবল দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।

 গণভোট নিয়ে সরকার যে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে এটা নিয়ে আইনে কী আছে, বা এ বিষয়ে  ইসি কী মনে করছে, জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা মনে করি  সরকারই এটার ( গণভোট) প্রস্তাব করছে, সরকারই এটার উদ্যোক্তা, যারা জুলাই সনদ সাইন করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কাজেই সরকার যদি তার তরফ থেকে বলে আমরা কী করবো।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকার বললে তো বলতেই পারে। আমি এটাকে খুব খারাপ বা ভালো মনে করি না। অসুবিধা আছে বলেও আমি মনে করি না।’’

আইনে কী এরকম কোনও বিধিনিষেধ আছে কিনা জানতে চাইলে এই কমিশনার বলেন, ‘‘আইনে তো বিধিনিষেধ... সরকার তো এমনি ইলেকশনে নিরপেক্ষ থাকবে। এখন এটা তো সরকার করেছে। তারা যদি এটা সীমিত বুঝানোর জন্য বলে আমি তো মনে করি এর মধ্যে অসুবিধা কিছু নাই। ’’
সরকার ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, যেমন- বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্যান্য যারা করছে, এটাও কি আসলে করতে পারে কিনা প্রশ্নে রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘‘সরকার তো বলতেই পারে। উপদেষ্টারা বলতেই পারে। কিন্তু অন্যান্য সরকারি বডি (সংস্থা) এগুলোতে চুপচাপ থাকাই ভালো।’’

একই প্রশ্ন আরেক নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকারকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘‘এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’’