শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-শাকসু নির্বাচন এই সময়ে হোক চায়নি সরকারও। নির্বাচন কমিশনও পক্ষে ছিল না। তবে কেন জাতীয় নির্বাচনের প্যারালাল সময়ে শাকসু’র আয়োজন?
এ প্রশ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মহলের। এই দু’টি প্রশ্নের সুরাহা না হওয়ার কারণে সংক্ষুব্ধ অংশের দু’জন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত সোমবার উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলেন। চাইলেন স্থগিতাদেশ। আদালত চার সপ্তাহের জন্য নির্বাচন স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে স্থগিতাদেশের আগে থেকেই শাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে ছিল শিক্ষার্থীরা।
বিকাল ৩টা থেকে তারা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে রেখেছে। ২৭ বছর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে শাকসু নির্বাচন। বছর খানেক আগে থেকেই এ নির্বাচনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেই প্রশাসনের উপর চাপ ছিল। অনেক আগেই আয়োজন করা যেত এ নির্বাচনের। এতদিন কেন হলো না, এ নিয়ে এন্তার প্রশ্ন সব মহলে। জাতীয় নির্বাচনের মুহূর্তে কেন এই নির্বাচন? অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ৫ই জানুয়ারি এসেছিল একটি চিঠি। সেই চিঠিতে জাতীয় নির্বাচনকালীন সময়ে শাকসু’র আয়োজন না করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল। সেই চিঠিটি এখনো গায়েব। পৌঁছেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এএম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরীর কাছে। এরপর ১২ই জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন থেকেই একই ভাবে চিঠি দেয়া হয়।
এ চিঠিতে জাতীয় নির্বাচনকালীন সময়ে শাকসু নির্বাচন না করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানানো হয়। নির্বাচন কমিশনের চিঠি পাওয়া গেলেও শিক্ষা উপদেষ্টার দপ্তরের চিঠি পাওয়া যায়নি। আর নির্বাচন কমিশনের চিঠির পর ক্যাম্পাসে আন্দোলন চাঙ্গা হলে ১৫ই জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এএম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তারা শাকসু নির্বাচনের অনুমতিপত্র নির্বাচন কমিশন থেকে নিয়ে আসেন। এ ব্যাপারে উপাচার্য বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেনÑ শিক্ষা উপদেষ্টার কার্যালয়ের চিঠি এখনো তার হাতে পৌঁছেনি। বিষয়টি নিয়ে তিনি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। চিঠি কোথায় গেল সেটির ব্যাপারে তদন্ত করে সিদ্ধান্ত জানাবে কমিটি।
তবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন শাকসু নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। তিনি জানান, এখন যেহেতু বিষয়টি উচ্চ আদালতে গেছে এবং নির্দেশনা রয়েছে সে অনুযায়ী কার্যক্রম চলবে। আর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি কাজ করছেন। আশা করা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতি বুঝবে। শিক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন; শিক্ষা উপদেষ্টার চিঠি রহস্যজনক কারণেই গায়েব করা হয়েছে। যদি সেটি পাওয়া যেত তাহলে নির্বাচনের ব্যাপারে অনেক আগেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেত। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের চিঠিতেও বিষয়টি পরিষ্কার ছিল। কিন্তু শাকসু নির্বাচন করতে উপাচার্য কেন ইসিতে গেলেন? তিনি সেখানে না গিয়ে দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে পুরো বিষয়টি ইসিকে অবগত করতে পারতেন। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা উপাচার্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন।
আজ ছিল শাকসু নির্বাচন। ইসি’র নির্দেশনার পরও নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছিল। ধোঁয়াশার মধ্যেও নির্বাচনের আয়োজন চলছিল ক্যাম্পাসে। এই অবস্থায় গতকাল দুপুরে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন শাবি’র বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা। সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. শাহ মো. আতিকুল হক ও ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম। এ সময় শিক্ষকরা বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে নানা ইস্যু তৈরি হয়েছে। আমরা উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত ও বিব্রত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি এবং সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয় অবগত করেছি। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে বিএনপিপন্থি ৮ জন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন।’ তাদের প্রেস ব্রিফিংয়ের পরপরই শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন। তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন ছাড়াও উপাচার্যের ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন।
বিকাল ৫টায় উপাচার্য মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তিনি এখনো তালাবদ্ধ রয়েছেন। সঙ্গে কর্মকর্তারা রয়েছেন। বিকাল ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের বিক্ষোভ চলছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডিতে শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বিকালে খবর এসেছিল উচ্চ আদালতের চেম্বার জজ আদালতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে যাওয়া হয়েছে। তবে তাদের আবেদন শুনানি হয়নি।
দুপুরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের শিক্ষকরা। এতে তারা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ইউটিএলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানিয়েছি এই নির্বাচন করার জন্য। আমরা প্রত্যাশা করছি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নির্বাচন করবে। আমরা ইউটিএল সাস্ট চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো ইনশাআল্লাহ। কয়েকজন শিক্ষক অসহযোগিতার কথা বলেছেন। আমরা বলতে চাই, অধিকাংশ শিক্ষক এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. সাজেদুল করিম পুরো ঘটনায় বিব্রত। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন, শিক্ষা উপদেষ্টার কার্যালয়ের চিঠি না পাওয়াই হচ্ছে সংকটের মূল কারণ। এটি উপাচার্যও পাননি, আমিও পাইনি। নির্বাচন কমিশনের চিঠি পাওয়া গিয়েছিল। পরে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন উচ্চ আদালতের নির্দেশ সবাইকে মানতে হবে। সন্ধ্যায় এ ব্যাপারে জরুরি সিন্ডিকেট হবে।