জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বাংলাদেশের। যা সরকার নিজেই চূড়ান্ত করেছিল। সে হিসাব অনুযায়ী সামনে সময় আছে ১১ মাসেরও কম। এদিকে জুলাই ২৪ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দাবি করেন এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা অন্তত তিন থেকে ছয় বছর পিছিয়ে দেওয়ার। এ নিয়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনার, বিতর্কও হয়। এমনকি সরকারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গেও আলোচনা করেন ব্যবসায়ীরা। এতে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় তারা কোনো আবেদন করবে না। তবে ব্যবসায়ীরা চাইলে জাতিসংঘে আবেদন করতে পারে। আবার একই সঙ্গে উত্তরণের প্রস্তুতিও চালু রাখার কথা বলে আসছে সরকার। অবশ্য এরপর প্রায় এক বছর সময় কেটে গেছে। প্রকৃতপক্ষে এর প্রস্তুতি কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আবার সময়সীমা পেছানোর আবেদনও করেনি।
এ সময়ের মধ্যে নতুন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনো কোনো দেশের সঙ্গে তা করা সম্ভব হয়নি। চলতি মাসের শেষের দিকে ঢাকায় জাতিসংঘের সঙ্গে এ সংক্রান্ত অগ্রগতি পর্যালোচনায় একটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আমাদের শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা কম, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি, প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজস্ব আদায় কম, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, বৈদেশিক ঋণের চাপ এসব সমস্যা অনেক দিনের। যা বছরের পর বছর আরও ঘনীভূত হয়েছে। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানের কার্যকর কোনো উদ্যোগ আমরা দেখতে পাইনি। ফলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে এসব চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে যাবে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের সূচকে পিছিয়ে গেছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রতিবেদনেও তা উঠে এসেছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে। এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি, ওষুধ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ধরনের ধাক্কা আসতে পারে, তা আবার সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এমন শঙ্কা আমি দেখছি না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরোনোর পর রপ্তানি ও কূটনৈতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে সেসবের প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণে নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনাতেও সন্তোষজনক অগ্রগতি নেই বললেই চলে। চলতি মাস শেষে এ সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দেখতে চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এর আগে সর্বশেষ এপ্রিলে এ সংক্রান্ত এক বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ দেন ড. ইউনূস। এবার যেহেতু সময় পেছানোর আর কোনো সুযোগ নেই, তাই প্রস্তুতি যাই থাকুক স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে বের করে দেবে জাতিসংঘ। কিন্তু ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার। ইউরোপ, আমেকিার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির জন্য বিদেশে থাকা বাংলাদেশি মিশনগুলোকে নির্দেশা দিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেগুলোরও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এজন্য ফেব্রুয়ারিতে যে জাতীয় নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে সেই নির্বাচনের পরই মূলত চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে। কেননা নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে। নতুন করে সবকিছু আবার শুরু হবে। ফলে নতুন সরকারের জন্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে দেখা দেবে এই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়া।
সূত্র জানায়, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ মানে হলো একটি দেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং অবকাঠামোগতভাবে উন্নত হয়েছে এমন একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এটি দেশের জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু এর কিছু বড় চ্যালেঞ্জও আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এই উত্তরণের পর বাংলাদেশ অনেক ধরনের আন্তর্জাতিক সুবিধা হারাবে। যেমন- ইউরোপ, কানাডা ও জাপানের বাজারে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ আইনে ছাড়, বাণিজ্য সহায়তা ও অনুদানমূলক ঋণ পাবে না। এসব সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার অর্থ হলো-রপ্তানির বাজারে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ বৃদ্ধি পাবে। এসব দেশের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির জন্য অতিরিক্ত শুল্ক গুনতে হবে। এতে রপ্তানি খাতের ওপর বড় ধরনের ধাক্কা আসবে। অবশ্য তখন বাণিজ্য সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে এর প্রস্তুতি হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বাংলাদেশ এফটিএ করতে হবে। যেসব কাজ মূলত উত্তরণের আগেই সম্পন্ন করতে হবে। যা হবে উভয় দেশের অর্থনৈতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ার পর আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে তা হয়নি। তবে চায়না ও জাপানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক আগের চেয়ে ভালো পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, আমরা একেক দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছি। এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে। কারণ, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক বা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতেও (যেমন ভারত, চীন) এ ধরনের শুল্ক সুবিধা পেয়ে থাকে। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপির আওতায় এ শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে ওষুধশিল্প। এলডিসি থেকে বের হলে ওষুধশিল্পের ওপর মেধাস্বত্ব বিধিবিধান আরও কড়াকড়ি হবে। এর আগে বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মানদণ্ডের তিনটিতেই উত্তীর্ণ হয়। ২০২১ সালেই চূড়ান্ত সুপারিশ পায় যে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ হতে পারে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে প্রস্তুতির জন্য আরও দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ যদি এলডিসি থেকে উত্তীর্ণ হয়, তাহলে বাংলাদেশই হবে প্রথম দেশ, যারা তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়ে বের হবে।