নির্বাচনের আর বাকি আছে ২৮ দিন। বুধবারও (১৪ জানুয়ারি) সাবেক দুই কূটনীতিককে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘‘নির্ধারিত ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর একদিন আগেও নয়, একদিন পরেও নয়।’’ এর আগেও একাধিকবার প্রধান উপদেষ্টাকে এই কথা বলতে শোনা গেছে—নির্ধারিত দিনে নির্বাচন হবে। অথচ প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশেরও সময় চলে এসেছে। এরই মধ্যে দলগুলো নিজেদের নির্বাচনি কার্যালয় খুলেছে। জোটগুলো আসন ভাগাভাগি করেছে। তাহলে শঙ্কাটা কোথায়? বারবার তারিখ উল্লেখ করে দেওয়া প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ঘুরছে—তবে কি এখনও নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে কোনও শঙ্কা রয়েছে? কেন তিনি ’১২ তারিখেই নির্বাচন হবে’ কথাটি ক্রমাগত বলছেন।
তারিখ ঘোষণার পর নানা অনুষ্ঠানে নিশ্চিতকরণ
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর ১৪ ডিসেম্বর সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় ছয় জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর মর্মান্তিক নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ফোন করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে। আলাপকালে ড. ইউনূস বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর নির্বাচন করবে।’’ এরপর ২৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। সে সময়েও প্রধান উপদেষ্টা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান। এমনকি খালেদা জিয়ার জানাজার পরে পাকিস্তানের সংসদীয় স্পিকার এবং নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের বৈঠকগুলোতে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। এতেও প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ১২ ফেব্রুয়ারির অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’’
২২ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সময়েই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে পুনরায় নিশ্চিত করেন। সেদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে হওয়া নিয়ে যে সংশয় ছিল—তা দূর হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা।’’
নির্বাচন স্থগিতের নানা প্রচেষ্টা
প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগে নির্বাচন স্থগিতের আবেদন নিয়ে কোনও না কোনও পক্ষ আদালতে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দেশে চরম নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আসন্ন জাতীয় নির্বাচন স্থগিত চেয়ে ১৪ জানুয়ারি হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান এই রিট দায়ের করেন। এর আগে, নির্বাচনের সব কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে গত ৩ ডিসেম্বর রিট দায়ের করেছিলেন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম। পরে ৮ ডিসেম্বর ওই রিট উত্থাপিত হয়নি বলে খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। সে সময় আদালত রিটকারী আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘‘দেশের সব মানুষ এখন নির্বাচনমুখী। নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট দায়ের করার এখন উপযোগী সময় নয়। এ ধরনের রিট এ সময়ে গ্রহণযোগ্য নয়।’’
কোন অনিশ্চয়তা থেকে প্রধান উপদেষ্টা বারবার নির্বাচনের তারিখ নিশ্চিত করেন প্রশ্নে তার উপ প্রেসসচিব আজাদ মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিদেশি কূটনীতিকরা নানা ধরনের শঙ্কার কথা শুনতে পান। তারা যখন প্রধান উপদেষ্টার কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান—তখন তাকে বারবারই স্পষ্ট করতে হয় যে ১২ তারিখেই নির্বাচন হবে।’’
‘‘উনি তো (ইউনূস) চান ১২ তারিখ নির্বাচন হোক, সে কারণে ওনাকে বলতে হয়’’ উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মাঝে নানা ধরনের উদ্বেগময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হাদি হত্যার মধ্য দিয়ে একটা সংকট তৈরি করে নির্বাচন থেকে দেশকে অন্যদিকে নেওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে প্রধান উপদেষ্টাকে বারবার নির্বাচনের তারিখ উল্লেখ করতে হচ্ছে।’’
কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও এখন আর শঙ্কা নাই উল্লেখ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, ‘‘বৃহৎ পরিসরে তেমন কোনও ইস্যু দেখছি না। মাঠে এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা আছে। সরকারের সদিচ্ছাটা গুরুত্বপূর্ণ। তারা এখন নির্বাচনে যেতে চাচ্ছে। এই পর্যায়ে নির্বাচনের কোনও বিকল্প নেই। সেটিই তাদের জন্য সেফ এক্সিট তৈরি করবে। একটা রাজনৈতিক সরকার দরকার। তা না হলে যে ধরনের অরাজকতা চলছে, সেটা বন্ধ হবে না। কিছু ঝুঁকি আছে, কিন্তু সব দল নির্বাচনমুখী।’’
কেন বারবার প্রধান উপদেষ্টাকে এই কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হচ্ছে, নাকি তিনি নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে কোনও শঙ্কা দেখছেন—এমন প্রশ্নে ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, ‘‘নানা সময় নানা উদ্বেগ তো তৈরি হয়েছে। হাদি হত্যা, প্রথম আলো ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনাসহ নানা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেকে বলতে চেষ্টা করেছেন—নির্বাচন হতে দেবো না। এখন বাংলাদেশে যে অবস্থা, গণতন্ত্রের দিকে যেতে চাইলে—নির্বাচনই একমাত্র পথ, নির্বাচন হওয়াটা জরুরি। বাংলাদেশের মানুষ সেদিকেই যাচ্ছেন।’’