Image description

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার খুচরা বাজারে যখন সারের তীব্র সংকটে কৃষকরা হাহাকার করছেন, ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নৌপথে দেদার মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে সরকারি সার। মাঝেমধ্যে কোস্টগার্ড ও পুলিশের অভিযানে সারের কিছু চালান আটক হলেও মূল পরিমাণের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য। অসাধু ডিলার ও চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেটের কারণে বেশি দাম দিয়েও স্থানীয় কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় কৃষি খাত।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন পৌরসভাসহ ২২টি ইউনিয়নে মোট ২২ জন নিবন্ধিত ডিলার রয়েছেন। সরকারি চাহিদাপত্রের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রত্যেক ডিলারের নামে ২২ টন করে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এই সার ডিলারদের পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রি করার কথা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূল কারসাজিটি ঘটছে জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়নগুলোতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার একাধিক ডিলার জানান, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এলাকার ইউনিয়নগুলোতে কৃষকের সংখ্যা এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ অনেক কম। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী সেসব ইউনিয়নের ডিলাররাও প্রতি মাসে সমপরিমাণ (২২ টন) সার বরাদ্দ পাচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে এই সারের চাহিদা কম থাকার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন অসাধু ডিলাররা। তারা মাস শেষে উদ্বৃত্ত সার স্থানীয় বাজারে বিক্রি না করে অধিক মুনাফার লোভে সরাসরি চোরাকারবারিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী ও কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা প্রথমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। এরপর সাধারণ কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে চড়া দামে সার বিক্রি করেন। আর মাস শেষে উদ্বৃত্ত থাকা বড় একটি অংশ চড়া মূল্যে চোরাকারবারিদের কাছে গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়। চোরাকারবারিরা গভীর রাতে ট্রলারে করে এসব সার নদী ও সমুদ্রপথে সরাসরি মিয়ানমারে পাচার করে দিচ্ছে।

ক্ষুব্ধ কৃষকরা জানান, ডিলাররা যদি পাচারকারীদের কাছে সার বিক্রি না করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন, তবে দাম একটু বেশি হলেও অন্য এলাকার কৃষকেরা অন্তত সার পেতেন। কিন্তু সার সরাসরি দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাওয়ায় এখন আমরা চড়া দাম দিয়েও সার পাচ্ছি না।

তবে পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চর কুকরিমুকরির সার ডিলার ও মেসার্স জাকির ট্রেডার্সের মালিক মো. জাকির হোসেন।

তিনি দাবি করেন, ‘আমার ডিলারশিপের আওতায় সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করা হচ্ছে। সারের কালোবাজারি বা চোরাই পথে বিক্রির মতো কোনো অপকর্মের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

সর্বশেষ বুধবার রাতে উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানাধীন তেঁতুলিয়া নদী থেকে ৪৯২ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্টগার্ড। অভিযানটি চালিয়েছিলেন কোস্টগার্ডের চরমনিকা দক্ষিণ জোনের সদস্যরা। আটক হয় আটজন। গত ১২ আগস্ট উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের বেতুয়া নতুন ফিশারি ঘাট এলাকা থেকে ২৯৩ বস্তা সার জব্দ করে পুলিশ। পরে ২৩ আগস্ট বিকালে উপজেলার চর কচ্ছপিয়া ঘাটে ট্রলারসহ ১৭৫ বস্তা সার আটক করেন কোস্টগার্ডের সদস্যরা।

চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, সার পাচারের সঙ্গে জড়িত আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ‘এসব সার পাচারে আমাদের উপজেলার ডিলার জড়িত আছে বলে মনে হয় না। তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’