প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিতর্কিত দুই প্রকৌশলীকে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন-মো. সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও আব্দুল মান্নান। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ রুটে দায়িত্ব দেওয়া হবে না। এছাড়া তাদের স্টেশন ত্যাগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলাকালে তাদের ঢাকাতেই অবস্থান করতে হবে।
বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত চলছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সূত্রমতে, সম্প্রতি লন্ডন স্টেশনে আউটস্টেশন এয়ারক্রাফট টেকনিক্যাল সার্টিফিকেশন প্রদানের জন্য প্রকৌশলী কর্মকর্তা সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও আব্দুল মান্নানকে মনোনীত করা হয়েছিল। কিন্তু ২৯ অক্টোবর জাপানের নারিতা বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং এ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার পর তাদের ওই দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিবর্তে প্রকৌশলী কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান (পি-৩৫০১৮) ও বদরুদ্দোজা মো. মাহফুজকে (পি-৩৫০৯৭) লন্ডন স্টেশনের দায়িত্ব দেওয়ার দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ।
ভিভিআইপি ফ্লাইটের ত্রুটি ঘিরে বিতর্ক : গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ব্যবহৃত হয় বিমানের বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজ। বিজি-৩৭৬ ও বিজি-৩৭৭ ফ্লাইটের উড্ডয়নের আগে ও পরে কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে ২৯ অক্টোবর নারিতা বিমানবন্দরে ঢাকা ফেরার প্রস্তুতিকালে উড়োজাহাজটির স্পয়লারে ত্রুটির সতর্কবার্তা দেখা দেয়। এ কারণে পুশব্যাক ও ট্যাক্সি করার পরও উড্ডয়ন বাতিল করতে হয়। পরে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রক্রিয়া শেষে ফ্লাইটটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীদের ভোগান্তির পাশাপাশি ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তা এবং বিমানের প্রকৌশল বিভাগের ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া। সংশ্লিষ্টদের দাবি, উড়োজাহাজটির স্পয়লারের ত্রুটি পুরোপুরি নিরসন না করেই ন্যূনতম সরঞ্জাম তালিকা (এমইএল)-এর ব্যাখ্যা ব্যবহার করে উড্ডয়নের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে যেখানে সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের তুলনায় বাড়তি সতর্কতা ও নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণের প্রয়োজন, সেখানে কারিগরি ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই হয়েছিল কিনা সেটা দেখতে হবে। এছাড়া ২০১৪ সালের বিমান লিজ-সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলার বিচারাধীন আসামি সাদেকুল ইসলামকে এমন সংবেদনশীল দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে।
তদন্তের মুখে প্রকৌশল বিভাগ : প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির ঘটনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি প্রকৌশল বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্তে উড়োজাহাজটির কারিগরি ইতিহাস, ত্রুটি শনাক্তকরণ, এমইএল প্রয়োগ এবং উড্ডয়নযোগ্যতার সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ রুট থেকে দুই প্রকৌশলীকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তদন্ত চলাকালে প্রশাসনিক সতর্কতা হিসাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ভিভিআইপি ফ্লাইটের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে কারিগরি সিদ্ধান্তের সামান্য বিচ্যুতিও বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে বিরত রাখা যৌক্তিক।
তবে শুধু দায়িত্ব পরিবর্তন করেই ঘটনার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কার নির্দেশে এবং কোন কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে উড়োজাহাজটিকে উড্ডয়নযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট করতে হবে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা বা নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিমানের কারিগরি ছাড়পত্র প্রদানের পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।