সারা দেশে প্রথম ধাপে ১ হাজার ৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই উপজেলার সব ইউনিয়নে একসঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রাথমিক তালিকা মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবারের মধ্যে চূড়ান্ত করা হতে পারে। তবে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে না।
গতকাল রোববার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
ইসি সচিব বলেন, পাঁচ ধাপের ইউপি নির্বাচন আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি শুরু হবে। ওইদিন প্রথম ধাপের নির্বাচন শেষে ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আর প্রথম ধাপের নির্বাচনের ছয় সপ্তাহ আগে তপশিল ঘোষণা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
তিনি বলেন, আইনগত সময়সীমার পাশাপাশি আবহাওয়া, উপকূলীয় এলাকার পরিস্থিতি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও লজিস্টিকস বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের ধাপ নির্ধারণ করা হচ্ছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের সিংহভাগ নির্বাচন প্রথম দুই ধাপে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপগুলোতে নির্বাচনের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমবে।
আখতার আহমেদ বলেন, কোনো উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বা নির্বাচনী সাইকেলের মধ্যে চলে এলে ওই উপজেলার সব ইউনিয়নে একসঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচনী লজিস্টিকস পরিচালনা সহজ হবে। তবে কিছু ইউনিয়নে মামলা ও সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। সেসব বিষয় যাচাই করতে প্রাথমিক তালিকা মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কারণে কোনো ইউনিয়ন নির্বাচনের আওতায় এলে সেটিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আশা করছে কমিশন।
ইসি সচিব জানান, নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী সামগ্রীর মজুত পর্যালোচনার পাশাপাশি তিন ধরনের ব্যালট পেপার ছাপানোর প্রস্তুতিও চলছে। এ বিষয়ে সরকারি বিজি প্রেস ও সিকিউরিটি প্রেসের সঙ্গে আলোচনা করেছে কমিশন। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের অন্য কোনো নির্বাচন নিয়ে এই মুহূর্তে কমিশনের পর্যালোচনা নেই।
আগামী নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে না বলে জানান ইসি সচিব। তবে মজুত থাকা ইভিএমগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, ইভিএমের সংখ্যা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করতে চূড়ান্ত স্টক টেকিং শুরু হয়েছে। এ জন্য গঠিত কমিটি কাজ করছে। যন্ত্রগুলো কী পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত জানানো যাবে।
ইভিএমে থাকা ব্যাটারির পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। এ কারণে শুধু সংখ্যাগত হিসাব নয়, যন্ত্রগুলো কীভাবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে নিষ্পত্তি করা যায়, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ইভিএম সংরক্ষণে ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, বিষয়টি নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে।
ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডির তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকে ভর্তির সময় দেওয়া তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেজ তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন। ইসি সচিব জানান, ছয় বছর বয়স থেকে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির সময় জন্মনিবন্ধন সনদে যে তথ্য দেওয়া হয়, তা সংগ্রহ করে ডাটাবেজের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে ভবিষ্যতে ভোটার নিবন্ধনের সময় তথ্য যাচাই সহজ হবে।
এ ছাড়া ভোটার নিবন্ধন ফরম ও সফটওয়্যারে পারিবারিক তথ্য বা ‘ফ্যামিলি ট্রি’ যুক্ত করার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বাবা-মায়ের কততম সন্তান, তার বড় ভাই বা বোনের নিবন্ধন নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। নতুন ভোটারদের পাশাপাশি পুরোনো ভোটারদের নবায়নের সময়ও এসব তথ্য নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এনআইডির তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের সঠিক ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসি সচিব। তিনি বলেন, অনেক সময় একই তথ্য সংশোধনের আবেদন একাধিক পর্যায়ে নাকচ হয়। এতে আবেদনকারীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অথচ সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি দেওয়া হলে অনেক সংশোধন সহজেই করা সম্ভব।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হওয়া এক নারীর জন্মসাল ১৯৯৭ থেকে ২০০২ করার আবেদন করা হয়েছে। এতে তার বয়স ১৮ থেকে কমে ১৩ বছর হয়ে যায়। এ ধরনের সংশোধন আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
নাম বা জন্মতারিখে টাইপের ভুল, অক্ষর কিংবা সংখ্যার স্থানবদলের মতো ভুল যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে সংশোধন করা যায়। তবে বাবা-মায়ের নাম বা শিক্ষাগত যোগ্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নথি প্রয়োজন। সঠিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করা যেমন জরুরি, তেমনি জাতীয় ডাটাবেজের নির্ভরযোগ্যতা রক্ষা করাও কমিশনের দায়িত্ব বলে জানান তিনি।
এদিকে এনআইডি কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে—এমন ধারণা সঠিক নয় বলে জানান ইসি সচিব। তিনি বলেন, স্মার্টকার্ড বিতরণে সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতার কারণে সবাইকে কার্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত লেমিনেটেড কার্ডও বৈধ। কার্ডের ১০ সংখ্যার নম্বরের মাধ্যমে ডাটাবেজ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য যাচাই করা যায়। তাই লেমিনেটেড কার্ড ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই।