মুন্সীরহাট বাজার। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার একটি গ্রামীণ জনপদ। এই বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি। এখানের কয়েক গ্রামের ২০ জন মানুষ। তাঁরা পূর্ব পরিচিত। কেউ চিকিৎসক, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যাংকার, কেউবা ব্যবসায়ী। সবাই স্বাবলম্বী ও প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা পরিকল্পনা করেন গ্রামের বাজারে একটি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। যেখানে অর্থের সংকটে কারও চিকিৎসা আটকাবে না। এ ছাড়া পরীক্ষার নামে রোগীর গলা কাটা হবে না। কোনো এম আর, ফার্মাসিস্টকে কমিশন দিয়ে রোগীর চিকিৎসার ব্যয় বাড়াবেন না। চিকিৎসা কেন্দ্রকে ব্যয়বহুল ও আতঙ্কের করবেন না। সেই পরিকল্পনা থেকে তাঁরা গড়ে তোলেন মুন্সীরহাট ক্লিনিক। অনেকে নাম দিয়েছেন ‘গরিবের হাসপাতাল’।
স্থানীয় ও ক্লিনিক সূত্র জানায়, ২০ জন উদ্যোক্তা মিলে ক্লিনিকটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন চিকিৎসক। এ ছাড়া আরও রয়েছেন ১৫ জন চিকিৎসক। চিকিৎসকদের সবাই এই এলাকার বাসিন্দা। তাঁরা পাশের বাসন্ডা, যুগীরহাট, মেশতলা, চাঁনপুর, বিষয়ভাগ, ফুলমুড়ি, কাদঘর, কনকপুর, শুভপুর, আনন্দপুর ও খিরনশালসহ বিভিন্ন গ্রামের অধিবাসী। সরেজমিন দেখা যায়, ক্লিনিকে রোগীর ভিড়। সচ্ছল মানুষের সঙ্গে রয়েছে নিম্নবিত্তের ভিড়। রোগীদের একজন কামাল হোসেন। তিনি একসময় রিকশা চালাতেন। এখন বয়স হয়েছে, অবসর সময় কাটান। খাবারটা ছেলেদের পরিবারে জুটে গেলেও চিকিৎসা করাতে হিমশিম খান। এই ক্লিনিকে আসার পর তার চিকিৎসকের ফি, টেস্ট ও বিনামূল্যে ওষুধের ব্যবস্থা করে দেন। এরকম প্রতিদিন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগী বিনামূল্যে সেবা পেয়ে থাকেন। সাতবাড়িয়ার সফিকুর রহমান, ফুলমুড়ির হাসান হাজারী, যুগীরহাটের কাজী নজরুল ইসলাম নজির, কনকপুরের দীন মোহাম্মদ ও আকলিমা বেগম জানান, এখানে টাকার জন্য কারও চিকিৎসা আটকায় না। এখানের চিকিৎসকরা সবাই এই এলাকার। তাই সবাই সবাইকে চেনেন। যার সামর্থ্য নেই, তাকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অহেতুক টেস্ট দেওয়া হয় না।
স্থানীয় মুন্সীরহাট হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক ইয়াছমিন আক্তার বলেন, যাঁরা হাসপাতাল দিয়েছেন তাঁদের অধিকাংশ আমাদের ছাত্র। তাঁরা শহরে না থেকে গ্রামে থেকে চিকিৎসা দিচ্ছে, যা ব্যতিক্রম। এখানে সচ্ছলদের থেকে বিল নেওয়া হয়। তা-ও বাজারের তুলনায় কম। এ ছাড়া কাউকে অর্ধেক ছাড় কাউকে পুরোপুরি ছাড় দেওয়া হয়।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, এখানের মানুষের ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়ার তেমন সামর্থ্য নেই। তাই আমরা কম মূল্যে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। যাদের সামর্থ্য নেই তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছি। এ ছাড়া কারও জটিল সমস্যা হলে রোগী কল্যাণ ফান্ড থেকে তাকে অন্যত্র চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসা নয়, সেবাটাই আমাদের নিকট মুখ্য।