ইটের গুঁড়া, চুন, বালি, সিমেন্ট, সিরামিকের মাটি, এমনকি হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে ভেজাল সার। আকর্ষণীয় মোড়কে আসল সারের ছদ্মবেশে এসব বিষাক্ত উপকরণ ছড়িয়ে পড়ছে কৃষকের হাতে, প্রতারিত হচ্ছেন লাখো চাষি, ঝুঁকিতে পড়ছে মাটির স্বাস্থ্য ও ফসলের উৎপাদন। দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হচ্ছে টনকে টন ভেজাল সার ও নকল সার তৈরির কাঁচামাল; সিলগালা করা হচ্ছে কারখানা। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ও কারখানার মালিককে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এসব ঘটনায় ফসলের উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ স্বীকার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেছেন, ‘বাজারে ভেজাল সার ও কীটনাশকের কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষকদের সঙ্গে যাতে কেউ প্রতারণা করতে না পারে, সেজন্য মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছেন।’
কমছে উৎপাদন, জমি হারাচ্ছে উর্বরতা : কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এসব ভেজাল সার জমিতে প্রয়োগ করার পর ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। জমি হারাচ্ছে উর্বরতা। একশ্রেণির অতিমুনাফালোভী ও অসাধু চক্রের কারসাজিতে তছনছ হয়ে যাচ্ছে তাঁদের স্বপ্ন। ইটের গুঁড়ো, চুন, বালি, কাদা, সিমেন্ট এবং জীবনঘাতী হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের মতো রাসায়নিক মিশিয়ে অহরহ বানানো হচ্ছে বিষাক্ত ‘ভেজাল সার’। চোখধাঁধানো রং আর ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংমিশ্রণে এসব সার ব্যবহারে নষ্ট হচ্ছে মাঠের পর মাঠ ফসল। একই সঙ্গে চিরতরে উর্বরতা হারাচ্ছে মাটির বুক। এই নীরব সর্বনাশ কেবল কৃষকের পরিবারকেই ধ্বংস করছে না, চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে গোটা খাদ্যনিরাপত্তাকে।
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এসব সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পর অনেকের ফসল নষ্ট হয়েছে। কৃষকদের স্বার্থে অসাধু ব্যবসায়ী ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’ বিশিষ্ট কৃষিবিদ অনুপ কুমার দাস বলেন, ‘ভেজাল মিশ্রিত সার কিনে কৃষক প্রতারিত হচ্ছেন। ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন। ভেজাল সার কারখানা বন্ধ এবং কেনাবেচা বন্ধ করতে না পারলে কৃষি অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। কৃষককে বাঁচাতে এবং মাঠের উৎপাদনে গতি ফেরাতে এখনই কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ও ভেজাল সারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন প্রয়োজনীয়। অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট চক্রকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না করলে দেশের কৃষিপণ্য উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার হুয়াকুয়া বাজারের সার ব্যবসায়ী সরকার এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান সরকার বলেন, অনেক ব্যবসায়ী বাজারে নকল সার বিক্রি করে কৃষকদের ঠকাচ্ছেন। বাজারে যেসব কোম্পানির সারের চাহিদা কম সেসব কোম্পানির সার ভালো বলে কৃষকের কাছে চালিয়ে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে দামও বেশি নিচ্ছেন। এতে করে একদিকে কৃষক প্রতারিত হচ্ছেন অন্যদিকে তাদের ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে। তবে আমরা বিভিন্ন কোম্পানির ভালো সার বিক্রি করে থাকি। সরকারি সারও বিক্রি করে থাকি। এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘বাজারে ভেজাল সার ও কীটনাশকের কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষকদের সঙ্গে যাতে কেউ প্রতারণা করতে না পারে, সেজন্য মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছেন। যেকোনো সার বা কীটনাশক নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ল্যাব টেস্টের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা বা সহায়তার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।’
অভিযানেও থামছে না ভেজাল সার বিক্রি : জানা গেছে, গত শনিবার রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের কালশারডারা এলাকায় মেসার্স মোখলেছুর রহমান ট্রেডার্সে অভিযান চালিয়ে ভেজাল সার তৈরির উপকরণভর্তি ১ হাজার ১২৭ বস্তা জব্দ করে উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে ইটের গুঁড়া, মাটি, ডলোমাইট চুন, ডিমের খোসা, পাথুরি চুন ও অন্যান্য উপকরণ পাওয়া যায়। এসব উপকরণ দিয়ে টিএসপি, ডিএপি, পটাশ ও জিপসাম সারের নকল তৈরি করে বাজারজাতের অভিযোগ রয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে নকল টিএসপি সার তৈরির অভিযোগে একটি কারখানায় অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে প্রায় ২৫০ বস্তা প্রস্তুত ভেজাল সার এবং আরও ৩০০ বস্তা চুন, সিমেন্ট ও সিরামিক মাটি জব্দ করা হয়। কারখানার মালিক মো. জামাল হোসেনকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কারখানাটি সিলগালা করা হয়। একই দিন ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানার হযরতপুর ইউনিয়নের আলিপুর এলাকায় মেঘনা ফার্টিলাইজার লিমিটেড নামের একটি কারখানায় র?্যাব-১০ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে নকল সার, নিষিদ্ধ কীটনাশক ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় জিয়াউর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত ১৬ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার তালা উপজেলার লাউতাড়া গ্রামে র?্যাব-৬ ও স্থানীয় প্রশাসনের অভিযানে ৮৭০ কেজি নকল সার, ৯০০ লিটার ভেজাল তরল কীটনাশক এবং কৃষি উপকরণ তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। অভিযানে ব্যবসায়ী মশিউর রহমান মোড়লকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। গত ২২ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া শহরতলির ত্রিমোহনী বাজারে রোহান ট্রেডার্সে অভিযান চালিয়ে ২৫ বস্তা ভেজাল ডিএপি সার জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভেজাল সার বিক্রির দায়ে ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
২৭ আগস্ট সৈয়দপুর বাজার এলাকায় ভেজাল সার তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়ে ৭২ বস্তা ভেজাল সার ও নামিদামি কোম্পানির মোড়ক জব্দ করা হয়। একই দিনে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় ভেজাল সার বিক্রির অভিযোগে এক বিএডিসি ডিলারকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
১৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভেজাল কীটনাশক প্যাকেটজাতের অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ সময় শত শত বস্তা ভেজাল ইউরিয়া, এমওপি, ডিএপি ও টিএসপি সার জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ৩০ জুলাই নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ২০০ বস্তা কাঁচামালসহ এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়।