ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর রোগের ভয়াবহতা বুঝে ওঠার আগেই প্রাণ হারিয়েছেন ৬৮ শতাংশ রোগী। সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া, বিপৎসংকেত দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে যাওয়া এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শারীরিক অবস্থার অবনতি- এসব কারণে দ্রুত মৃত্যুর মুখে পড়ছেন ডেঙ্গু রোগীরা। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের নিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এসব চিত্র। চলতি বছর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩০০ জনের বেশি। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ জানতে ১১৯ জনের তথ্য পর্যালোচনা করেছে আইইডিসিআর।
ডেঙ্গু ডেথ রিভিউ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেসব রোগীর চিকিৎসা নেওয়ার সময়সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে, তাঁদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ তিন দিনের বেশি সময় পর চিকিৎসা নিতে গেছেন। ৬৬ শতাংশ রোগী বিপদসংকেত দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তির আগেই ৩৫ শতাংশ রোগী ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেছিলেন। আর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এক দিনের মধ্যেই মারা গেছেন ৩৮ শতাংশ রোগী। যে ৯টি হাসপাতাল থেকে রোগীর তথ্য নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতাল। লিঙ্গভিত্তিক তথ্য পাওয়া ১১৭ জনের মধ্যে ৫২ শতাংশ ছিলেন নারী। আর বসবাসের স্থানসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া ৮৯ জনের মধ্যে ৫৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক রোগী হাসপাতালে না এসে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ফার্মেসি থেকে বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেছেন। ডেঙ্গু জটিল আকার ধারণ করার উপসর্গ অনেকে বুঝতেই পারেননি। উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পরও হাসপাতালে আসতে দেরি করেছে রোগীদের বড় একটি অংশ। এ তথ্যগুলো ডেঙ্গু রোগীর ডেথ রিভিউতে উঠে এসেছে। এ পর্যন্ত ১১৯ জন রোগীর মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এটা ধারাবাহিকভাবে চলবে।’
শকের লক্ষণ ছিল ৭৮ শতাংশ রোগীর : প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়ই অধিকাংশ রোগীর অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। ৭৮ শতাংশ রোগীর মধ্যে শকের লক্ষণ ছিল। এ ছাড়া ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম উল্লেখ করা হয়েছে। ৩১ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষেত্রে এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম এবং ১৬ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণসহ ডেঙ্গুর কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্যান্য কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। বিপদ বাড়িয়েছে ব্যথানাশক সেবন : তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬৮ শতাংশ রোগী উপসর্গ শুরুর তিন দিনের বেশি সময় পর চিকিৎসা নিতে গেছেন। ৬৬ শতাংশ রোগী বিপৎসংকেত দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হন। পর্যালোচনা অনুযায়ী, উপসর্গ শুরুর পর প্রথম চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময় সাধারণত ছিল তিন দিন। হাসপাতালে ভর্তির আগেই ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের তথ্যও উঠে এসেছে পর্যালোচনায়।
৭০ শতাংশের আইসিইউ প্রয়োজন হয়েছে : গুরুতর অসুস্থতার কারণে ১০৩ জন রোগীর তথ্যের মধ্যে ৭২ জনের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল। অর্থাৎ তথ্য পাওয়া রোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশের আইসিইউ সেবা দরকার হয়েছে। এতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় রোগীদের সংকটাপন্ন অবস্থার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপও ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত : ডেথ রিভিউয়ের সারসংক্ষেপে মৃত রোগীদের আগের রোগের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, প্রায় চারজনের একজনের ডায়াবেটিস এবং পাঁচজনের একজনের উচ্চ রক্তচাপ ছিল। আগে থেকে এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ডেঙ্গু হলে শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
২১ থেকে ৫০ বছর বয়সিদের মৃত্যু বেশি : পর্যালোচনায় বয়সভিত্তিক তথ্যেও গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। ১১৯ জন মৃত রোগীর মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সি ছিলেন ২৫ জন। ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সি ২০ জন এবং ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সিও ২০ জন। সব মিলিয়ে ২১ থেকে ৫০ বছর বয়সি ৬৫ জন, অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
মৃত্যু ৩০০ ছাড়াল : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ৩০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।