Image description

২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে দ্বিতীয় দফায় ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে গতকাল থেকে। চলবে আগামীকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত। এবারও নানান ফির নামে শিক্ষার্থীদের পকেট কাটছে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা ও বোর্ডের নির্দেশনা উপেক্ষা করে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি টাকা। এতে করে প্রথম দফায় আসন বরাদ্দ পেয়েও খরচের কারণে পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারেনি অনেকে। ফলে আসনের ছয়-সাত গুণ বেশি আবেদন পড়লেও এসব কলেজে আসন ফাঁকা রয়েছে। এক অভিভাবক জানান, তার ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ ভর্তি ফি ৮ হাজার ৫০০ টাকা জেনে পছন্দের কলেজে আবেদন করেছিল। আসন বরাদ্দ পাওয়ার পর ভর্তি করাতে গিয়ে দেখে ৫০ হাজার টাকার বেশি লাগবে। মাসিক বেতন প্রায় ৮ হাজার টাকা। ভর্তির টাকা কিস্তিতে দেওয়ার সুযোগ থাকলেও খরচের কথা ভেবে ভর্তি করাননি তিনি। এখন দ্বিতীয় দফায় অন্য কলেজে ভর্তি করাচ্ছেন। তার অভিযোগ, ভর্তি ফি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা থাকলে তিনি কলেজটিকে পছন্দের তালিকায় রাখতেন না।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার প্রথম ধাপে পছন্দের কলেজ বরাদ্দ পাওয়ার পরও ২৭ হাজার ৫৬৬ জন শিক্ষার্থী পুনরায় (রিঅ্যাপ্লাই) আবেদন করে। এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশ অর্থের কারণে ভর্তি হতে পারেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের ভর্তির পছন্দক্রমে তৃতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা সিটি কলেজ। ৪ হাজার ২৮০টি আসনের বিপরীতে প্রথম দফায় আবেদন করে ৩১ হাজার ৯৫১ জন। সাত গুণের বেশি আবেদন পড়লেও ফাঁকা ছিল ৫৩৫টি আসন। ফলে কলেজটিকে দ্বিতীয় দফায় শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে হচ্ছে। বাড়তি খরচের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারেনি বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

কলেজটিতে ভর্তি হওয়া এক শিক্ষার্থী জানায়, টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালালেও তাঁকে দরিদ্র তহবিলে ৫০০ ও সমাজকল্যাণ ফি বাবদ ৪০০ টাকা দিতে হচ্ছে। অথচ এই তহবিল থেকেই তাঁর সহযোগিতা পাওয়ার কথা। প্রথম কিস্তিতে তাঁকে দিতে হয়েছে ২০ হাজার ৩০০ টাকা। এর মধ্যে ভর্তি ফি ৮ হাজার ৭৫০, উন্নয়ন ফি ২ হাজার, নবীনবরণ ফি ৮৫০, লাইব্রেরি সেমিনার ফি ৭০০, এসি ও জেনারেটর ফি ৭০০, পরিচয়পত্র ফি ৩০০ এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডার ফি ২০০ টাকা। সেপ্টেম্বরে ভর্তি হলেও জুলাই-আগস্টের বেতন বাবদ দিতে হয়েছে ৬ হাজার ৮০০ টাকা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তিতে দিতে হবে যথাক্রমে ২৪ হাজার ৮২৪ ও ২৫ হাজার ১৫০ টাকা। প্রথম বছরেই খরচ ৭০ হাজার টাকার বেশি। এসি ও জেনারেটর ফির পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ-ওয়াসা ফি বাবদ ২ হাজার ৫০০, আকস্মিক দুর্ঘটনা খরচ ৫০০ এবং গ্র্যাচুইটি ফি ৫০০ টাকা দিতে হবে। শুধু নবীনবরণ ফি থেকেই কলেজটি প্রায় ৩৬ লাখ টাকা আদায় করছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এক বিজ্ঞপ্তিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ‘একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নীতিমালা-২০২৬’ অনুসরণের নির্দেশ দেয়। নীতিমালা অনুযায়ী, ভর্তির আগেই বোর্ড নির্ধারিত ফিসহ অনুমোদিত অন্যান্য খরচ নোটিস বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। অতিরিক্ত ফি আদায় করা যাবে না; প্রতিটি আদায়ের বিপরীতে রসিদ দিতে হবে এবং পরবর্তীতে আদায় করা ফির বিবরণী বোর্ডে জমা দিতে হবে। নীতিমালায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অনলাইন আবেদন ফি ২২০, রেড ক্রিসেন্ট ফি ২৪ ও বার্ষিক ক্রীড়া মঞ্জুরি ফি ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে সেশন চার্জ ও ভর্তি ফি ঢাকা মহানগরীতে ৫ হাজার, অন্যান্য মহানগরীতে ৩ হাজার, জেলা পর্যায়ে ২ হাজার এবং উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা। নন-এমপিও বা আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে উন্নয়ন ফি, সেশন চার্জ ও ভর্তি ফি বাবদ ঢাকা মহানগরীতে বাংলা ভার্সনে ৭ হাজার ৫০০ এবং ইংরেজি ভার্সনে ৮ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া যাবে। অন্যান্য মহানগরীতে এ হার যথাক্রমে ৫ ও ৬ হাজার, জেলা পর্যায়ে ৩ ও ৪ হাজার এবং উপজেলা পর্যায়ে ২ হাজার ৫০০ ও ৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া শিক্ষা বোর্ড শিক্ষার্থীপ্রতি সাতটি খাতে ৩৪০ টাকা নেবে। নীতিমালা লঙ্ঘন করলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি ও এমপিওভুক্তি বাতিলসহ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি কলেজের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অথচ রাজধানীর অনেক কলেজে নীতিমালা ও নির্দেশের তোয়াক্কা না করে কয়েকগুণ টাকা বাড়তি আদায় করছে। একসঙ্গে দিতে না পারলে কিস্তির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইটে খরচের তালিকাও প্রকাশ করেনি। ভর্তি রসিদ পর্যালোচনা ও সরেজমিন অনুসন্ধানে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রমাণ মিলেছে। কোনো কোনো কলেজ ভর্তি ফি বাবদ সরাসরি বাড়তি টাকা নিচ্ছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ফির নামে যুক্ত করছে অতিরিক্ত খরচ।

বিভিন্ন কলেজের ভর্তি রসিদে দুই ডজনের বেশি খরচের খাত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন, এসি, জেনারেটর, গ্যাস-বিদ্যুৎ-ওয়াসা, দুর্ঘটনা, নবীনবরণ, পারিবারিক নিরাপত্তা, লাইব্রেরি, ম্যাগাজিন, দরিদ্র তহবিল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, হোল্ডিং ট্যাক্স, মিলাদ মাহফিল, পরিচয়পত্র, সফটওয়্যার, আবেদনপত্র, ডায়েরি, শিক্ষা সফর, সার্ভিস চার্জ, সিলেবাস, ল্যাব, ক্রীড়া, আইসিটি ল্যাব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ফি।

মাতুয়াইলের ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে ইংরেজি ভার্সনে ভর্তি ফি ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতনের বাইরে ২৩টি খাতে নেওয়া হচ্ছে ২৪ হাজার ৭০০ টাকা। বাড়তি ফি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ রাজধানীর অধিকাংশ নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।

তবে ব্যতিক্রম দেখা গেছে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। স্বনামধন্য কলেজটি বিজ্ঞান বিভাগের অসামরিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভর্তি ফি রাখছে ইংরেজি ভার্সনে ৮ হাজার ২৫ টাকা এবং বাংলা ভার্সনে ৭ হাজার ৫০০ টাকা। অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালা মানতে বাধ্য। বোর্ডের জনবল কম থাকায় সর্বত্র নজরদারি সম্ভব হয় না। অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।