Image description

সত্তরোর্ধ্ব রওশন আলী। দেশে মসলা সরবরাহকারীদের একজন তিনি। ব্যবসার প্রয়োজনে ছুটে বেরিয়েছেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। সুঠাম দেহের অধিকারী এ ব্যবসায়ীর ছিল সচ্ছল সংসার। কিন্তু রাস্তায় বেপরোয়া গতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কেড়ে নিয়েছে তার সবকিছু। তিনি আজ সর্বসান্ত। হারিয়েছেন চলার ক্ষমতাটুকু। গত ৪ অক্টোবর তার জীবন বাঁচানোর স্বার্থে কেটে ফেলতে হয়েছে ডান পা। দীর্ঘদিনের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তিনি আজ পথের ফকির। গতকাল রোববার পঙ্গু হাসপাতালের সি-এ-১ ওয়ার্ডের জি-৩৫ নম্বর বেডে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রওশন আলী বলেন, মানুষ বাঁচাতেই অটোরিকশা বাতিল করা এখন সময়ের দাবি।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে ধামরাই থানাধীন কাকরান পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা এ ভুক্তভোগী বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে সাভার ঘৌরিপাড়া এলাকায় বেপরোয়া গতির কারণে তিনি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে খাদে পড়ে যান। আবার তার শরীরের ওপর দিয়েই ওই রিকশা চলে যায়। তার শরীরের রক্তে ভেসে যায় ঘটনাস্থল। কিন্তু নির্দয় চালক তাকে উদ্ধার না করে আরো দ্রুত গতিতে চালিয়ে এলাকা ত্যাগ করে। সেই থেকে তিনি নিয়মিত চিকিৎসা করালেও শেষ পর্যন্ত তার ডান পা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। এ ধরনের ভুক্তভোগী শুধু রওশন আলী একা নন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনায় অসংখ্য ভুক্তভোগী অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে হাসপাতালের বেডে। অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। কেউ কেউ চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) জরুরি বিভাগের সূত্র মতে, অটোরিকশাজনিত দুর্ঘটনায় গুরুতর অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটিতে গড়ে প্রতিদিন ১৭ জন রোগী ভর্তি হন। চলতি মাসে এ ধরনের রোগী একটু কম। তারপরও গত ১ অক্টেবর থেকে ১০ অক্টোবর এই ১০ দিনে ভর্তি হয়েছেন ৯৯ জন। সার্ভারজনিত ত্রুটির কারণে সেপ্টেম্বর মাসের পরিসংখ্যানটি তারা সরবরাহ করতে না পারলেও গত আগস্টে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছে ৬০৪ জন। এর আগের মাসে অর্থাৎ জুলাইয়ের ৭ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৩শ’ জন। নিটোরের জরুরি বিভাগের টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা রিনা, মীম ও মাহমুদা এ প্রতিবেদককে বলেন, এক সময়ে রেজিস্টার খাতায় দুর্ঘটনার ধরনের স্থানে এখন একটি বাড়তি কলাম যোগ করতে হয়েছে, আর সেটি হচ্ছে অটোরিকশা। আগে আমরা শুধু আরটিএ লিখতাম। অটোরিকশায় দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ায় অফিসিয়ালভাবেই দুর্ঘটনার ধরনে একটি বিশেষ কলাম ‘অটোরিকশা’ যোগ করতে হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়ার্ড মাস্টার নূর মোহাম্মদ বলেন, এক সময়ে বেশি রোগী আসতো মোটর সাইকেল দুর্ঘটনার। কিন্তু এখন রোগীদের একটি বড় অংশই আসে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে। তিনি আরো বলেন, একটি হাসপাতালেই যদি গড়ে ১৭-১৮ জন রোগী আসে তাহলে দেশব্যাপী চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে এ ধরনের কত রোগী যায় সেটি শুধু অনুমানের বিষয়। এটি এখন একটি জাতীয় সমস্যার আদলে দেখা দিয়েছে। অবৈধ অটোরিকশা বন্ধ করা না হলে সাধারণ মানুষের জন্য আরো দুর্ভোগের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবসা করছে। আর এগুলো চালাচ্ছে সাংগঠনিক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পলাতক সন্ত্রাসীরা। যাদের অনেকেরই সড়ক আইন সম্পর্কে ধারণা নেই। নেই রাস্তায় এ ধরনের যান চালানোর দক্ষতা।

এদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির জরিপ মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ২২ জন, জেলা হাসপাতালে ১০ থেকে ১২ জন আর উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে গড়ে প্রতিদিন ৬-৭ জন রোগী ভর্তি হন। সংস্থাটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে সারাদেশে ৪ হাজার হাসপাতালের এ ধরনের রোগীর ভর্তির সংখ্যাটাই বলে দেয় ব্যাটারিচালিত রিকশার ভয়াবহতা! আর কি পরিমাণ চাপ পড়ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর। এ পেক্ষাপটে অটোরিকশা থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়ে চিকিৎসার ব্যয়ভার কয়েক গুণ বেশি। বিষয়টি ভেবে দেখার সময় এসেছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই।

সারাদেশে কতগুলো অবৈধ অটোরিকশা রয়েছে এর সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান নেই কোনো সংস্থার কাছে। তবে পুলিশের একটি অনুমাননির্ভর জরিপ মতে, সারাদেশে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ৬০ লাখ। আর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ধারণামতে, ঢাকায় ১২ থেকে ১৫ লাখ অটোরিকশা রয়েছে। আগে যেসব রিকশার নিবন্ধন ছিল, সেগুলোও এখন ব্যাটারিচালিত হওয়ায় অবৈধ হয়ে গেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এগুলো এখনো বাতিল করার আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। প্রধান সড়কে চলার নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মানছে না চালকরা।
সংসদে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক যানবাহনের কাঠামোগত মান, ব্রেকিং ব্যবস্থা, আলো ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সিপিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার কথা বলা হয়েছে; এর প্রায় ৯০ শতাংশ দেশে তৈরি। গবেষণায় দেশে তৈরি এসব রিকশার চেসিস ও ব্রেকিং ব্যবস্থার মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে একের পর এক অভিযান হয়। কোথাও কোথাও রিকশা আটকের পর অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। তবে কিছু কিছু জব্দ ও ডাম্পিং করা হলেও কোনোটিতেই যেন থামছে না এসব যানবাহনের দাপট। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ঢুকে পড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা। কোথাও বাস-গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে, কোথাও আবার মোড়, ইউটার্ন ও সিগন্যালের কাছে এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে তৈরি করছে যানজট। শুধু চলাচল নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো চলছে এসব ভয়ঙ্কর যান তৈরির কারখানা ও গ্যারেজ। সম্প্রতি কিছু কিছু এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। ডিএমপি জানিয়েছে, অবৈধভাবে অটোরিকশা তৈরি ও বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। সরকার যখন এসব অবৈধ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন তৈরি কারখানায় অভিযান চালায়, জব্দ করে ঠিক তখনি স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় কয়েক হাজার চালক রাস্তা অবরোধ করে। তারা অবৈধ দাবি আদায়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে।

একদিকে জব্দ ও ডাম্পিং, অন্যদিকে নতুন করে উৎপাদনÑ এই দুই প্রক্রিয়া পাশাপাশি চলায় নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। অভিযান আছে, কিন্তু উৎপাদন থামছে না এমন প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে শুধু চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ একটি অটোরিকশা সড়কে নামার আগে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে কারখানা, গ্যারেজ, চার্জিং পয়েন্ট, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী ও মালিকের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখে শুধু সড়কে অভিযান চালালে নতুন যানবাহন নামার প্রবাহ বন্ধ করা কঠিন।

অন্যদিকে সম্প্রতি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা হবে এবং প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ঘোষণা আর প্রয়োগের মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়েছে।

পঙ্গু হাসপাতালের জি-৫৬ নম্বর খাটের সাথে বেল্ট দিয়ে বাঁধা আনিস সিকদারের একটি পা। ১৭ দিন আগে বরিশালের মুলাদী দক্ষিণ কাজির চরের নিজ বাড়ির সামনে দিয়ে সড়ক পার হচ্ছিলেন। কোথা থেকে বেপরোয়া গতির ব্যাটারিচালিত অটো ভ্যান এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ভেঙে যায় তার পা। বরিশাল হাসপাতাল হয়ে এখন তার ঠিকানা পঙ্গু হাসপাতাল। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পা কেটে ফেলতে না হলেও পায়ের সাথে খাটে রশির বাঁধন করেই থাকতে হবে অনেক দিন। এ অবস্থায় অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছেন তিনি।

নোয়াখালীর বাসিন্দা সদর উপজেলার দুর্গানগরের বাসিন্দা মিজান পাটোয়ারী (৪০) ইলেকট্রিক্যাল মালামালের ব্যবসা করেন ঢাকার আবদুল্লাপুরে। ৯ অক্টোবর নিজের মোটরসাইকেলে চেপে যাচ্ছিলেন নবীনগরের বাসায়। পথে বিপরীতমুখী বেপরোয়া অটোরিকশা উঠিয়ে দেয় তার মোটরসাইকেলে। কয়েক গজ দূরে ছিটকে পড়েন মিজান। তার ডান পা ভেঙে তিন টুকরো হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে আনা হয় নিটোরে। ২ নং ওয়ার্ডের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের জি-৬ বেডে যন্ত্রণায় ছটফট করা মিজানের জীবন বাঁচাতে কেটে ফেলতে হয়েছে ডান পা। পা হারানো এ যুবকের আর্তনাদ দেখে কারো চোখে পানি চলে আসে। মিজানের অভিযোগ, কোনো ধরনের লাইসেন্স কিংবা প্রশিক্ষণ ছাড়া এ ধরনের যন্ত্র যার-তার কাছে ছেড়ে দেয়ার জন্য দায়ী কে? পৃথিবীর সব দেশে সব কিছুতে একটি সিস্টেম রয়েছে। কিন্তু কোনো সিস্টেম নেই আমাদের দেশে। আর এই সিস্টেম না থাকার খেসারতই দিতে হচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ নিরীহ মানুষদের।

একই ওয়ার্ডের ৫ নং বেডে ভর্তি আছেন কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ার ওষুধের দোকানদার হাবিবুর রহমান (৩৫)। গত ১০ সেপ্টেম্বর হাসনাবাদ বসুন্ধরা এলাকায় তাকে বহনকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি উল্টে যায়। হাবিবুর বলেন, চালককে বার বার অনুরোধ করা হচ্চিল যেন দেখেশুনে আস্তে চালায় কিন্তু সে কথা শোনেনি। গাড়ির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে অন্যের জন্য বিপদের কারণ হলো সে। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক হাবিবুর নিজের জীবনের পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্ধেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো বাহন নয়, এটি মরণ ফাঁদ। সরকারকে এখনই এগুলো বন্ধ করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শুধু হাবিবুর কিংবা মিজান নয়, বেপরোয়া অটোরিকশায় বাড়ছে অহরহ দুর্ঘটনা। থমকে যাচ্ছে জীবন। একটি অটোরিকশার কয়েক সেকেন্ডের বেপরোয়া গতি বদলে দেয় একটি পরিবারের পুরো জীবন। কেউ হারাচ্ছেন অঙ্গ, কেউ মাসের পর মাস শয্যাশায়ী থাকছেন। অটোরিকশার মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা জননিরাপত্তা বিপন্ন করে তুলছে। এই মরণ ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে হলে স্থানীয় প্রশাসন ও হাইওয়ে পুলিশকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা উচ্ছেদ, নির্দিষ্ট রুটের বাইরে চলাচল নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি।